সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের কথায় কথায় বলতেন, ‘খেলা হবে’। এটি একসময় তার রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মন্ত্রণালয়ের ভেতরেও ‘খেলা’ চলত—যার নামই ছিল ‘খেলা হবে’। এটি ছিল মন্ত্রণালয়ের ভেতরের একটি দুর্নীতির সিন্ডিকেটের সাংকেতিক নাম।
এই সিন্ডিকেটের মূল কাজ ছিল কমিশনের বিনিময়ে ঠিকাদার নির্বাচন করে দ্রুত ফাইল পাস করানো। তদন্তে উঠে এসেছে, ওবায়দুল কাদের তার স্ত্রী ইশরাতুন্নেছা কাদের, ভাই আবদুল কাদের মির্জা, ফেনীর সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী, নোয়াখালীর সাবেক এমপি একরামুল করিম চৌধুরী এবং সাবেক সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহকে নিয়ে এই সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। লক্ষ্য ছিল সড়ক ও সেতু নির্মাণসহ মন্ত্রণালয়ের সব প্রকল্পে ভাগ-বাটোয়ারা নিশ্চিত করা।
২০১১ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। এই সময়ে কাদের পরিবারসহ তার ঘনিষ্ঠদের সম্পদ বেড়েছে কয়েক গুণ। ওবায়দুল কাদেরের নিজের নির্বাচনি হলফনামা অনুযায়ী, তার সম্পদ বেড়েছে ছয় গুণেরও বেশি। তবে প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশেও তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়েছেন।
এক আইনজীবী দুদকে ওবায়দুল কাদের ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দিয়ে আবেদন করেন। এরপর দুদকের গোয়েন্দা বিভাগ প্রাথমিক অনুসন্ধান চালায়। অধিকাংশ অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় কমিশন থেকে বিস্তারিত তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দুদক সূত্র জানায়, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ৯০ শতাংশ কাজ গেছে মাত্র ১২-১৫টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ছিল কাদের সিন্ডিকেটের সখ্য। আগেভাগেই ঠিক হতো, কোন প্রতিষ্ঠান কাজ পাবে। পরে কাগজে-কলমে দরপত্র আহ্বান করা হতো।
এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—হাসান টেকনো বিল্ডার্স, রানা বিল্ডার্স, এনডিই, মোজাহার এন্টারপ্রাইজ, তাহের ব্রাদার্স, মাসুদ হাইটেক ইঞ্জিনিয়ার্স, স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স, এম এম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স, রিলায়েবল বিল্ডার্স, তমা কনস্ট্রাকশন, মাহফুজ খান লিমিটেড, আবেদ মনসুর কনস্ট্রাকশনসহ আরও অনেকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীতে ১৩৭টি বাস কেনার জন্য প্রস্তাব পাস হয়নি দেড় বছর। মূল কারণ ছিল, কাদের সিন্ডিকেটের পছন্দের প্রতিষ্ঠান কাজ পায়নি। বিআরটি সূত্র বলছে, প্রথম দরপত্রে ৬টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়, সর্বনিম্ন দর ছিল ১৮৮ কোটি টাকা। পরবর্তী দরপত্রে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ২০৩ কোটি, তৃতীয় দরপত্রে তা হয় ৩৬০ কোটি টাকা। এত বড় পার্থক্যের পরও কেন একাধিকবার দরপত্র আহ্বান করা হলো—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সিঙ্গাপুরের অরচার্ড রোডে ওবায়দুল কাদেরের নামে রয়েছে তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট। তার স্ত্রীর নামে আছে আরও দুটি। সিঙ্গাপুরেই তার নামে একটি মানি একচেঞ্জ ও ট্রাভেল এজেন্সি রয়েছে। ব্যাংককে তার নামে একটি হোটেলের শেয়ার এবং ছোট ভাই মির্জার নামে নিউইয়র্কে অ্যাপার্টমেন্ট ও পেট্রোলপাম্প রয়েছে। এসব বিনিয়োগের নেপথ্যে অর্থ পাচার হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
২০০৮ সালে ওবায়দুল কাদেরের পেশা ছিল লেখক ও সাংবাদিকতা। ২০২৪ সালে এসে তিনি ‘বেসরকারি চাকরিজীবী’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। এই সময়ে তার স্থাবর সম্পদ বেড়েছে ছয় গুণ, আর অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে ১৩ গুণের বেশি। ২০০৮ সালে তার অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ২২ লাখ টাকায়। স্ত্রীর সম্পদও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকায়। বর্তমানে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রয়েছে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা এবং স্ত্রীর নামে রয়েছে প্রায় ৫২ লাখ টাকা।
তিনি এখন একটি গাড়ির মালিক, যার মূল্য ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া উত্তরায় একটি পাঁচ কাঠার প্লট, স্ত্রী ইশরাতুন্নেছার নামে ১ হাজার ৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট এবং যৌথ মালিকানায় কৃষি জমি রয়েছে। তবে অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, এসব হলফনামায় উল্লেখিত সম্পদই আসল নয়। তার প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ এসবের বহু গুণ বেশি। ওবায়দুল কাদেরের রাজনৈতিক ‘খেলা হবে’ স্লোগান এখন তার মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির প্রতীকে পরিণত হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে স্পষ্ট, শুধু কথায় নয়—বাস্তবেও তিনি খেলেছেন ক্ষমতার চূড়ায় বসে।

