দেশে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে মাদক সমস্যা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বে শিথিলতা ও কিছু সদস্যের সরাসরি সম্পৃক্ততায় মাদক এখন হাতের নাগালে। রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল—সবখানেই মাদক সহজলভ্য। এমনকি স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিনই বাড়ছে মাদকসেবীর সংখ্যা। তাঁদের মতে, বর্তমানে দেশে প্রায় দেড় কোটি মাদকসেবী রয়েছে। করোনাকালে মাদকাসক্তির প্রবণতা বেড়ে যায় এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতায় গত কয়েক মাসে অন্তত ২০ লাখ নতুন মাদকসেবী যুক্ত হয়েছে।
গতকাল বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। গডফাদারদের তালিকা হালনাগাদ করে দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “যেসব কর্মকর্তা মাদকে জড়াবে, তাদের বাস হবে কারাগারে।” তিনি জানান, ইতোমধ্যে উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তাকে ক্লোজ করে গ্রেপ্তারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বিশেষজ্ঞ সূত্রে জানা গেছে, দেশে মাদকের চাহিদা বেড়েই চলেছে। এর ফলে প্রতিবছর পাচার হচ্ছে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি। জাতিসংঘের সংস্থা আংকটাডের ২০২৩ সালের জুনের এক প্রতিবেদনেও বলা হয়, শুধু মাদক সংশ্লিষ্ট কারণে বাংলাদেশ থেকে বছরে ৪৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ পাচার হয়। অর্থাৎ, প্রায় পাঁচ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। এই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অবৈধ মাদকপাচারের মাধ্যমে অর্থপাচারে বাংলাদেশ বিশ্বের পঞ্চম এবং এশিয়ায় শীর্ষে অবস্থানে রয়েছে।
মাদকের ভয়াবহতা থাকলেও দেশে নেই কোনো সাম্প্রতিক ও পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, ২০১৮ সালে দেশে ৩৬ লাখ মাদকসেবীর তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। এরপর আর কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই। অতিরিক্ত সচিব ও অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, “বাংলাদেশে মাদক নিয়ে গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। যে যার মতো তথ্য উপস্থাপন করছে। আসল সংখ্যা জানতেই গবেষণা দরকার।”
সূত্র মতে, দেশে মাদকসেবীদের বড় অংশই তরুণ। একসময় শুধু ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন ছাত্রীদের মধ্যেও মাদকের প্রবণতা বাড়ছে। চলতি বছরের শুরুতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদক সেবনের সময় আটক হওয়া ৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে কয়েকজন ছিলেন ছাত্রী। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির ঘাটতিতে নতুন নতুন কৌশলে মাদক পাচার করছে চক্রগুলো। অ্যাম্বুল্যান্স, সবজি ও পণ্যবাহী গাড়ির আড়ালে চালান পাঠানো হচ্ছে। কক্সবাজার, টেকনাফসহ সীমান্তবর্তী এলাকার কারবারিরা রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবার চালান সরবরাহ করছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দিলেও এখনো তা কেনা হয়নি। তবে ৮০ জন কর্মকর্তাকে অস্ত্র চালনায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী সাংবাদিকরাও মাদক চক্রের সঙ্গে জড়িত। কিছুদিন আগে রাজধানীর বনানীতে এমন চিত্র দেখা গেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে কক্সবাজারের তৎকালীন পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রহমত উল্লাহর বিরুদ্ধে ইয়াবা কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রকাশিত হয়। পরে তাঁকে শাস্তিমূলকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে ৮৫ জন গডফাদারসহ ১,২৩০ জন মাদক কারবারির তালিকা রয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের এমপি আবদুর রহমান বদির নামও রয়েছে। এই তালিকা হালনাগাদ করতে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মহাপরিচালক বলেন, “গডফাদারদের অনেক সময় ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। বাহকেরা নাম জানাতে পারে না। তবুও আমরা চেষ্টা করছি মূল হোতাদের শনাক্ত করতে।” মাদকাসক্ত সন্তানদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে অনেক মা-বাবা এখন নিজের সন্তানদেরই পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন। গত কয়েক বছরে এমন বহু ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, রাজশাহী, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায়।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মিলে মোট ২ লাখ ২৮ হাজার ৭০৯টি মাদক মামলা করেছে। এসব মামলার আসামি দুই লাখ ৪৪ হাজার ৮৯৪ জন। আজ ২৬ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস। জাতিসংঘ ১৯৮৭ সালে দিনটিকে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান: সবার জন্য প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও নিরাময়’। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর দিবসটি ঘিরে নানা কর্মসূচি পালন করছে।

