সুখবর!! সুখবর!! মদ বাজার-এর পক্ষ থেকে নিয়ে এলাম দেশি-বিদেশি ফরেন মাল। তাই দেরি কেন! এখনই অর্ডার করুন।’ এমনই আহ্বান জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘মদ বাজার’ নামে একটি পেজে খোলাখুলিভাবে চলছে বিদেশি ও দেশি মদের বিজ্ঞাপন। পেজটিতে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ ও বিয়ারের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে নিয়মিত পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি পোস্টেই রয়েছে হাজারো মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া। যোগাযোগের জন্য দেওয়া হয়েছে একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর। পোস্টে পণ্যের তালিকা ও দামের বিস্তারিত উল্লেখ করে জানানো হয়েছে, “২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশের যেকোনো জেলায় বাহক মারফত সরবরাহ করা হয়।”
এটাই শেষ নয়। ‘মদ্যপান কল্যাণ সমিতি’ নামে ফেসবুকে একটি প্রাইভেট গ্রুপ রয়েছে, যেখানে সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ২২ হাজারের বেশি। চার বছর ধরে সক্রিয় এ গ্রুপের পাশাপাশি ‘অ্যালকোহল লাভার বিডি’, ‘৯৯ বোতল ঢাকা হাব’, ‘ভোমরা ড্রিংকস কর্নার’, ‘চুয়াডাঙ্গা ড্রিংকস কর্নার’, ‘পটুয়াখালী বর্ডার ক্রস ড্রিংক হাউস’, ‘বিডি ব্র্যান্ড শপ’সহ আরও অসংখ্য পেজ ও গ্রুপে জমজমাট মাদকদ্রব্যের কেনাবেচা চলছে।
এসব গ্রুপের অনেকগুলোর সদস্য সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। শুধু ফেসবুক নয়, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, টেলিগ্রাম ও ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমেও চলছে যোগাযোগ ও অর্ডার। এভাবে তরুণ সমাজকে সহজেই টার্গেট করছে মাদক চক্র।
খবরের কাগজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই অনলাইন মাদক চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। তবে এসব ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্যোগ প্রশ্নের মুখে। মাঝে মাঝে দু-একজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তা ধারাবাহিক কোনো অভিযান নয়। সংশ্লিষ্ট সংস্থার গোয়েন্দারাও নিয়মিতভাবে এসব গ্রুপ ‘মনিটর’ করছেন না বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকেরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন বড় প্ল্যাটফর্ম। মাদক চক্র সেখানে তৎপর হবে, এটা স্বাভাবিক। এ জন্য গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবারকেও সন্তানদের চলাফেরা ও আচার-আচরণে নজরদারি করতে হবে।”
সম্প্রতি রাজধানীতে অনলাইন মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত একজনকে হাতেনাতে ধরেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। কৌশল হিসেবে এক নারী অনলাইনে অর্ডার দেন। পরে ডেলিভারির সময় সাত বোতল বিদেশি মদসহ ধরা পড়েন এক বাহক। তিনি প্রথমে নিজেকে একটি লাইসেন্সধারী বারের সদস্য দাবি করলেও পরে স্বীকার করেন, বার থেকে মদ কিনে খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সরবরাহ করতেন। ঢাকায় এমন আরও অনেকে এইভাবে ব্যবসা করছেন বলে জানান তিনি।
ডিএনসির ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিনির্ভর যুগে মাদক চক্র অনলাইনকে প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন মার্কেটপ্লেস, এমনকি ডার্কওয়েবেও চলছে ইয়াবা, আইস, কেটামিনসহ নানা ধরনের মাদকের লেনদেন। লেনদেনে ব্যবহৃত হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং ও বিটকয়েন। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, “অনলাইনসহ সব মাধ্যমেই র্যাবের মাদকবিরোধী অভিযান চালু রয়েছে। মাদকবিরোধী কার্যক্রম আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।” ঢাকা বিভাগের ডিএনসির উপপরিচালক খোরশিদ আলম বলেন, “মাদক চোরাচালানকারীরা নতুন নতুন কৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এসব মোকাবেলায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।”
মাদক বিক্রেতারা সাংকেতিক ভাষায় ইয়াবাকে ‘গুটি’, ‘আব্বা’, ‘ফল’ এবং গাঁজাকে ‘পাতা’, ‘সবজি’, ‘জয়েন’ বলে উল্লেখ করছে। সরাসরি ফোনালাপের বদলে যোগাযোগ করছে হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম ও মেসেঞ্জারে। কিছু সদস্য ধরা পড়লেও চক্রের মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। ডিএনসির কর্মকর্তারা জানান, এসব গ্রুপে ‘ফেক আইডি’ ব্যবহার করে উঠতি বয়সীদের টার্গেট করা হচ্ছে। অর্ডার দিলেই মাদক পাওয়া যাবে, বিষয়টা এমন নয়। ক্রেতা আসল কি না তা নিশ্চিত হতে হয় দীর্ঘ চ্যাটের মাধ্যমে। তারপর নির্দিষ্ট বাহক দিয়ে হোম ডেলিভারি দেওয়া হয়।
ডিএনসির ঢাকা মেট্রো উত্তর অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মো. মেহেদী হাসান বলেন, “অনলাইন মাদক ব্যবসা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গোয়েন্দা তদন্তের মাধ্যমে আমরা অপরাধীদের শনাক্ত করে অভিযান চালাচ্ছি

