সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর কবিরের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ করেছেন ব্যাংকের এক গ্রাহক। অভিযোগ করেন, তিনি গত ২০ বছর ধরে ব্যাংকের শীর্ষ পদে থেকে বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারি, শেয়ার কারসাজি ও নারী হয়রানিসহ নানা অনিয়ম করেছেন। অভিযোগ দায়ের করেছেন শিমুল সর্দার, যিনি একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও প্রধান উপদেষ্টার কাছেও আবেদন দিয়েছেন।
অভিযোগে বলা হয়, আলমগীর কবির দীর্ঘদিন ক্ষমতার অপব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মকে অবজ্ঞা করেছেন। তিনি নানা কৌশলে বিপুল অর্থপাচার চালিয়ে ব্যাংকের হাজার হাজার গ্রাহকের আমানতকে ঝুঁকিতে ফেলেছেন। তার বিরুদ্ধে নারী হয়রানির অভিযোগে ব্যাংকের ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। একাধিক নারী এ নিয়ে মামলা প্রস্তুত করছেন। পাশাপাশি গভর্নর ও অন্যান্য কর্মকর্তার কাছে তার পরিচালক পদ বাতিলের জন্য আবেদন করা হবে।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ আছে, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে তিনি নিজের ঘনিষ্ঠ লোকদের বিশেষ সুবিধায় ঋণ দিয়েছেন। কখনো ঋণের সুদ মওকুফ করেছেন, কখনো অবৈধভাবে ঋণ অনুমোদন করেছেন। অন্যান্য পরিচালকদের আপত্তি সত্ত্বেও একক কর্তৃত্ব ব্যবহার করে অনুপযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছেন।
শুধু ঋণ নয়, ব্যাংকের যন্ত্রপাতি কেনা, শাখা সম্প্রসারণ, ইন্টেরিয়র, বুথ বসানো এবং সফটওয়্যার সরবরাহ সব ক্ষেত্রেই তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল। এর মাধ্যমে তিনি হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে দেশ-বিদেশে বিলাসবহুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় বহুমূল্য বাড়ি ও হোটেল নির্মাণ করেছেন।
শেয়ার কারসাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) অভিযোগ করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসি গত ১৯ নভেম্বর বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের শেয়ার কারসাজির দায়ে আলমগীর কবিরকে ১২ কোটি টাকা জরিমানা করেছে।
অপরদিকে, আলমগীর কবিরের সময় অনিয়ম করে ব্যাংক থেকে ২৩২ কোটি টাকা ঋণ নিয়েও তা ফেরত দেয়নি এনবিএফআই বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। ব্যাংকের মূল কার্যক্রম ছাড়াও ফাউন্ডেশন ও গ্রিন স্কুলের তহবিল ওই প্রতিষ্ঠানটিতে আটকে আছে। টাকা ফেরত চেয়ে বারবার চিঠি দিলেও সাড়া মেলেনি। সুদও পরিশোধ হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বে লিজিংয়ের আর্থিক অবস্থা সংকটাপন্ন এবং তারা ঋণ পরিশোধে অক্ষম। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৭ (১-খ) ধারা লঙ্ঘন করে সাউথইস্ট ব্যাংক ঋণ দিয়েছে। ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বে লিজিংয়ের লোকসানের পরিমাণ ১৭২ কোটি টাকা। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আলমগীর কবিরের ঘোষণাপত্র অনুসারে বে লিজিংয়ের চেয়ারম্যান সুরাইয়া বেগম তার স্ত্রী। তাই ব্যাংকের সঙ্গে বে লিজিংয়ের লেনদেন ‘ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে লেনদেন’ হিসেবে গণ্য হবে।
সাউথইস্ট ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা জানাচ্ছেন, গত দুই দশক ধরে ব্যাংকের সবকিছু আলমগীর কবিরের ইশারায় চলে এসেছে। কখনো পরিবারের নামে, কখনো নিজের নামে ঋণ দিয়েছেন। এতে সহযোগিতা করেছেন ব্যাংকের কিছু বন্ধুরা। অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণ ফেরত দিতে পারেনি। যার ফলে ব্যাংক বিপাকে পড়েছে। তবে কর্মকর্তারা আশাবাদী, বর্তমান পরিচালনা পরিষদের যোগ্য নেতৃত্বে ব্যাংক আবার ঘুরে দাঁড়াবে।

