দেশজুড়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ঘর নির্মাণে দুর্নীতি ও অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে জড়িত ছিলেন বিভিন্ন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। অভিযোগ রয়েছে—দরপত্র ছাড়াই কাজ দেওয়া, শর্ত না মেনে নির্মাণ, ঘুষের বিনিময়ে ঘর বরাদ্দ ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারসহ একাধিক অনিয়ম হয়েছে। অনেক জায়গায় ঘরগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কোথাও তালাবদ্ধ, কোথাও আবার ঘর ব্যবহার হচ্ছে ছাগল পালনের জন্য।
আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৭ সালে ভূমিহীনদের জন্য ‘আশ্রয়ণ’ প্রকল্প চালু করে। পরে ২০২০ সালে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের আওতায় আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়। সরকার দাবি করে, ৫৮ জেলা ও ৪৬৪ উপজেলায় প্রায় ৪৩ লাখ ৪০ হাজার ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার পুনর্বাসিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৯ লাখ ১০ হাজারের বেশি ঘর দেওয়া হয়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে।
রংপুরের পীরগাছায় আশ্রয়ণের ৪৩০টি ঘর নির্মাণে বরাদ্দ দেওয়া হয় তিন লাখ চার হাজার টাকা করে। ১১০টি ঘরের পর ২০২৪ সালের শেষে ৩২০টি ঘরের নির্মাণ শুরু হয়। মাটি ভরাটে ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে ইউএনও নাজমুল হক সুমনের বিরুদ্ধে। তিনি নাকি ৪ কোটি টাকায় অতিরিক্ত মাটি বিক্রি করেন। ঘর নির্মাণে শর্ত লঙ্ঘন করে কম আয়তনের ঘর তৈরি করা হয় এবং ঘুষ নিয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বগুড়ার ধুনটে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৯৯টি ঘর নির্মাণে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৮ কোটি টাকা। তবে ৭৮টি ঘরের কোনো তথ্য সংরক্ষিত নেই। স্থানীয় সূত্র বলছে, ইউএনও সঞ্চয় কুমার মোহন্ত ঘুষের বিনিময়ে বরাদ্দ দিয়েছেন, প্রকৃত গৃহহীনরা বঞ্চিত হয়েছেন। ইট না দেওয়ায় ইটভাটার মালিককে জরিমানাও করা হয়। তবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় নির্মাণের কিছুদিন পরই ২৬৪টি ঘরে ফাটল দেখা দেয়। পুরনো ঘরের টিন ও লোহা দরপত্র ছাড়াই লোপাট হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে—সাবেক ইউএনও মমতাজ মহল নিজেই এসব অনিয়মে জড়িত ছিলেন। নতুন ঘরের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে, কোথাও দেয়াল ফেটে গেছে।
ঢাকার ধামরাইয়ে ৬৫০টি ঘরের মধ্যে অনেক ঘর এখন ফাঁকা। দেপাশাই এলাকায় ১৪৩টি ঘরের ২০টির বাসিন্দা সরে গেছেন। অনেকে ঘর বিক্রি করে চলে গেছেন। অভিযোগ, তালিকা তৈরিতে স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ ছিল প্রধান নিয়ামক। শরীয়তপুরের ডামুড্যায় ৪২টি ঘরের মধ্যে মাত্র ৮টিতে মানুষ থাকেন। বাকি ঘরগুলো তালাবদ্ধ বা ছাগল পালনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। চট্টগ্রামের রাউজানে ১৩০টি ঘরের অধিকাংশই বিক্রি হয়ে গেছে বা অন্যদের দখলে। অভিযোগ রয়েছে, বরাদ্দ পাওয়া অনেকেই ঘর বিক্রি করে চলে গেছেন।
ঢাকার কেরানীগঞ্জে আশ্রয়ণের ঘর বরাদ্দে আত্মীয়প্রীতি ও ঘুষ প্রধান ভূমিকা রেখেছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগকর্মী ও জেলা পরিষদের কর্মচারীরা নিজেরা ঘর নিয়েছেন। রোহিতপুরে ৪৫টি ঘরের বেশির ভাগই তালাবদ্ধ। বরাদ্দ পাওয়া অনেকে অন্যত্র বসবাস করেন। কমলনগরের দুটি প্রকল্পে ৬৯টি ঘর এক বছর ধরে তালাবদ্ধ। এসব ঘরের নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও দালালদের হাতে। তারা ঘর ভাড়া দেওয়া, বিক্রি এবং পুকুরে মাছ চাষ করে আয় করছেন। প্রকৃত গৃহহীনরা ঘর পাননি।
দেশজুড়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের নামে বরাদ্দকৃত কোটি কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। ইউএনও, রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। প্রকৃত গৃহহীনরা ঘর না পেয়ে বঞ্চিত হয়েছেন, আর প্রকল্পটি পরিণত হয়েছে একটি দুর্নীতিপূর্ণ বাণিজ্যে

