আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে দলীয় কমিটি ও মনোনয়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তিন মেয়াদে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা এই নেতা একই সময়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।
দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এবং একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র ঘেঁটে জানা গেছে, কমিটি গঠন ও মনোনয়ন বাণিজ্য থেকে ওবায়দুল কাদেরের আয়ের পরিমাণ অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কমিটি গঠনের একক ক্ষমতা ছিল তাঁর হাতে। তিনি শেখ হাসিনার কাছ থেকে মৌখিক অনুমোদন নিয়ে দলীয় কমিটিগুলো তৈরি করতেন, তবে সিদ্ধান্ত নিতেন মূলত আর্থিক বিবেচনায়। দলের ভেতরে এই অর্থকেন্দ্রিক তৎপরতার কারণে তিনি ‘কাউয়া কাদের’ নামে সমধিক পরিচিত।
ওয়ার্ড পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি কমিটি গঠনে চলত অবাধ লেনদেন। একটি ওয়ার্ড কমিটিতে সাধারণ সদস্য হতে হলে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হতো। সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হতে চাইলে দিতে হতো ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত। থানা পর্যায়ে কমিটির জন্য ১৫–২০ লাখ, জেলা পর্যায়ে ২৫–৩০ লাখ এবং মহানগরের জন্য ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো। প্রতিটি পর্যায়ের কমিটি গঠনে অর্থই হয়ে উঠেছিল মূল যোগ্যতা।
দলের আটজন সাংগঠনিক সম্পাদক আটটি বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁরা আগে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছ থেকে দরদাম করতেন। যে নেতা বেশি টাকা দিতে পারতেন, তাঁর নামই পাঠানো হতো ওবায়দুল কাদেরের কাছে। এরপর তিনি টাকার অঙ্ক যাচাই করে চূড়ান্ত করতেন কমিটির সদস্যদের নাম। যাঁরা নির্ধারিত টাকা দিতে পারতেন না, তাঁদের জন্য কমিটি গঠন হতো না। ঢাকার উত্তর-দক্ষিণসহ অনেক এলাকায় এ কারণেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়নি।
এভাবে গঠিত কমিটিগুলোর অধিকাংশতেই জায়গা পায় লুটেরা ও বিতর্কিত লোকজন। অনেক জায়গায় স্থানীয় মন্ত্রী-এমপি কিংবা ব্যবসায়ীরা অর্থ দিয়ে নিজেদের অনুসারীদের কমিটিতে বসিয়ে দেন। লোটাস কামাল নিজ নির্বাচনি এলাকার সব কমিটির জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা দিয়েছেন ওবায়দুল কাদেরকে। সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী এ বি এম তাজুল ইসলাম দিয়েছেন ১০০ কোটি টাকা।
কমিটি বাণিজ্যের পাশাপাশি মনোনয়ন বাণিজ্যও ছিল আরেকটি বড় উৎস। দুইটি জাতীয় নির্বাচন, দুইটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং একাধিক উপজেলা, পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এই বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সময়ে মনোনয়ন পেতে হলে প্রার্থীদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হতো। এ বাণিজ্যের মূল দায়িত্বে ছিলেন দলীয় দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া। তাঁর কাছে একটি নির্দিষ্ট তালিকা থাকত—কোন পদের জন্য কত টাকা দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে ২০ থেকে ৫০ লাখ, উপজেলা চেয়ারম্যানের জন্য ১ থেকে ৫ কোটি, পৌরসভার মেয়র পদের জন্য ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত দিতে হতো।
জাতীয় নির্বাচনে এমপি হওয়ার জন্য কোনো নির্ধারিত অর্থ ছিল না। রীতিমতো নিলাম পদ্ধতিতে মনোনয়ন দেওয়া হতো। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সর্বশেষ ‘ডামি’ নির্বাচনে শুধু ঢাকার একটি আসনের মনোনয়ন দিয়েই ওবায়দুল কাদের ১০০ কোটি টাকা নিয়েছেন।
শেখ হাসিনা মনোনয়ন না দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরেও সাবেক পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী ওবায়দুল কাদেরকে শত কোটি টাকা দিয়ে মনোনয়ন কিনে নেন। এ লেনদেনের টাকা সংগ্রহ করে সিঙ্গাপুরে গিয়ে আনেন বিপ্লব বড়ুয়া। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন, দল এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে টাকা ছাড়া কেউ মনোনয়ন পায় না। শুধুমাত্র হাতে গোনা কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা ছাড়া সবাই টাকা দিয়ে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন। এমনকি ঢাকা জেলা কমিটির ক্ষেত্রেও অভিযোগ রয়েছে যে সালমান এফ রহমান ২০০ কোটি টাকা দিয়ে কমিটি গঠন করেন। এরপর তিনি নিজে বৈঠকে বলেন, “তোমাদের কমিটি করতে আমার ২০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। আমার নির্দেশই হবে নীতি।”
ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কমিটি গঠনে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও, সেখানে বাণিজ্য হয়েছে অন্যদের মাধ্যমে। যুবলীগের কমিটি নিয়ন্ত্রণ করতেন শেখ ফজলে শামস পরশ ও তাঁর স্ত্রী নাহিদ যূথী। ছাত্রলীগের কমিটি বানাতেন ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতারা। এভাবে ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি, মাদক কারবারি, এমনকি হত্যা মামলার আসামিরাও দলে স্থান পেয়েছেন। আওয়ামী লীগের নেতারা নিজেরাই বলছেন—এই কমিটি ও মনোনয়ন বাণিজ্যই দলটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে

