চলতি ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতোমধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির বহিষ্কৃত নেতা গাজী সালাউদ্দিন আহমেদ তানভীর ও ৩৬টি প্রিন্টিং প্রেস মালিকের বিষয়ে তথ্য চেয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। তবে দুর্নীতির মূল নাটের গুরু হিসেবে যাদের নাম আসছে, সেই এনসিটিবির সাবেক চেয়ারম্যান, সচিব, পাঠ্যপুস্তক সদস্যসহ পাঁচজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। দুদকের এমন পদক্ষেপে মুদ্রণ খাতে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
দুদকের পাঠানো চিঠিতে এনসিটিবির কাছে পাঠ্যবই মুদ্রণে জড়িত চুক্তিপত্র, বই গ্রহণের রেকর্ড, ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অস্তিত্ব, বিল পরিশোধ, নিম্নমানের বই সরবরাহ এবং কাগজ আমদানির তথ্যসহ ছয় ধরনের নথি চাওয়া হয়েছে। এনসিটিবি এসব তথ্য ইতিমধ্যে দুদকে পাঠিয়েছে।
দুদক চিঠিতে ছয়টি বিষয় চাইলেও মূলত তদন্ত করছে প্রিন্টার্সদের সঙ্গে চুক্তির পর তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ১০ হাজার টন কাগজ আমদানির বিষয়টি। অভিযোগ উঠেছে, এ আমদানির মাধ্যমে তানভীর কমিশন বাবদ নিয়েছেন ৩৩ কোটি টাকা। অথচ এনসিটিবির নিজস্ব নীতিমালায় তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে চুক্তির সুযোগ নেই।
এনসিটিবির বিতরণ শাখার একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ বছর বই ছাপার কাজে ছিল ব্যাপক অনিয়ম। বিশেষ করে ২৮ শতাংশ শুল্ক মওকুফে চীন থেকে কাগজ ও আর্টকার্ড আমদানির ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়েছে। এক্ষেত্রে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কাগজের দাম বাড়ানো হয়।
প্রিন্টার্সদের কাছ থেকে টনপ্রতি ২৫-৩০ হাজার টাকা কমিশন নেওয়া হয়। এনসিপি নেতা তানভীরের পাশাপাশি এনসিটিবির সাবেক চেয়ারম্যান এ কে এম রিয়াজুল হাসান, সচিব শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস, সদস্য রিয়াদ চৌধুরী এবং বিতরণ নিয়ন্ত্রকও এ চক্রে যুক্ত ছিলেন।
বিতরণ শাখার তথ্য বলছে, কাগজ আমদানিতে ৫৩ শতাংশ শুল্কের মধ্যে ২৮ শতাংশ মওকুফ করিয়ে চীন থেকে আনানো হয় ৯ হাজার ৩৫০ টন কাগজ ও আর্টকার্ড। শুল্ক মওকুফের পর প্রতি টনের খরচ পড়ার কথা ৯৪ হাজার টাকা, কিন্তু সেটি বিক্রি করা হয় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায়। এতে প্রতি টনে মুনাফা হয় ৩৬ হাজার টাকা। শুধু কাগজ থেকেই প্রায় ২৮ কোটি টাকার মুনাফা করেছে ‘ইউনিয়ন অ্যাসোসিয়েটস’ নামের প্রতিষ্ঠানটি। আর্টকার্ডে আরও কয়েক কোটি টাকার মুনাফা হয়, যা মিলিয়ে মোট দুর্নীতির অঙ্ক দাঁড়ায় ৩৩ কোটি টাকা।
প্রিন্টার্সরা বলছেন, খোলা বাজারের চেয়ে কমদামে কাগজ পেতে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ওই কাগজের দাম বাজারমূল্যের চেয়েও বেশি ছিল। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, সরকার কেন শুল্ক ছাড় দিল, যদি সেটির কোনো সুফল ভোক্তারা না পান? চলতি বছর ৪০ কোটির বেশি বই ছাপতে প্রয়োজন হয় ১ লাখ ৫ হাজার টন কাগজ। এতে প্রতি টনে ২৫ হাজার টাকা করে কমিশন ধরলে মোট দুর্নীতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৬২ কোটি টাকা। এর সঙ্গে কাগজ আমদানিতে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আরও ৩৩ কোটি টাকা, মোট ২৯৫ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে এনসিটিবির বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরী বলেন, “দুদকের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন, তাই মন্তব্য করবো না।” অন্যদিকে ইউনিয়ন অ্যাসোসিয়েটসের চেয়ারম্যান ফখরুল আলম ফারুক বলেন, “কোনো দুর্নীতির তথ্য আমার জানা নেই, দুদকের চিঠিও পাইনি।”
দুদকের অনুসন্ধানে যেসব প্রেস প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- আমিন আর্ট প্রেস
- আনন্দ প্রিন্টার্স
- অনন্যা
- সরকার ও বলাকা
- অনুপম
- ফাহিম
- পাঞ্জেরী দ্য গুডলাক
- মৌসুমী অফসেটসহ আরও বহু প্রতিষ্ঠান।
মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, “চলতি বছর বই ছাপায় পুকুর নয়, সাগর চুরি হয়েছে। যাঁরা কারসাজির মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন, তারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ প্রিন্টার্সদের তলব করা হয়েছে।” তিনি সরকারের কাছে শুল্ক ফাঁকি আদায় ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানান।

