সারা দেশে নারী ও কন্যাশিশুদের ওপর নির্যাতন উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ধর্ষণ, হত্যা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারীরা। এসব ঘটনায় অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সারাদেশে ৯ হাজার ১০০টি মামলা হয়েছে। গড় হিসাবে মাসে ১,৮২০টি মামলা হচ্ছে, যেখানে গত বছর এ গড় ছিল ১,৪৬৪টি। ফলে, চলতি বছর প্রতি মাসে ৩৫৬টি মামলা বেড়েছে—যা স্পষ্টভাবে নির্যাতনের বিস্তারকে তুলে ধরে। নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছেন নারীরা কর্মস্থল, শিক্ষাঙ্গন, গণপরিবহন এমনকি নিজ ঘরেও। চলন্ত বাস, ট্রেন, লঞ্চ কিংবা অটোরিকশায়ও নারীরা নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছেন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৭৩৬টি কন্যাশিশুসহ মোট ১,৫৫৫ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৮১ জন ধর্ষণের শিকার, যাদের মধ্যে ৩৪৫ জন কন্যাশিশু। দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১০৬টি, যার শিকার ৬২টি শিশুসহ বহু নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ নারীকে, যাদের মধ্যে ১০ জনই শিশু। এছাড়া যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৫১ জন নারী, যার মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৩৫। উত্ত্যক্তের ঘটনা ঘটেছে ৩৪ জনের ক্ষেত্রে। আর হত্যার শিকার হয়েছেন ৩২০ জন নারী, যাদের মধ্যে ৬১ জন শিশু।
সম্প্রতি আলোচিত ঘটনার একটি ঘটে কুমিল্লার মুরাদনগরে। সেখানে এক নারীকে ধর্ষণের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। দেশজুড়ে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আরেকটি ঘটনায় ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলায় স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বিএনপির অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সাতজনের নাম উল্লেখ করে মামলা গ্রহণ করেছে পুলিশ। এ বিষয়ে ভোলা জেলা পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শরীফুল হক জানান, ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় তদন্ত করা হচ্ছে।
মানবাধিকার ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্ব পালনে গাফিলতির কারণেই এসব ঘটনা ঘটছে। মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী জানান, অনেক ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা স্থানীয়ভাবে ধামাচাপা পড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগের আইনি ফলোআপ থাকে না, ফলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসে না।
মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম জানান, যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তা মূলত পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে। বাস্তবে নির্যাতনের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো উচ্চপর্যায়ের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি—যা অত্যন্ত হতাশাজনক। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, প্রেমঘটিত সম্পর্ক, প্রতিশোধ, হতাশা বা অভিমান থেকে আত্মহত্যার ঘটনাও বাড়ছে।
মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুন মাসেই দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩৬৩টি। ধর্ষণ ৬৩টি, দলবদ্ধ ধর্ষণ ১৭টি, ধর্ষণ ও হত্যা চারটি। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন সাতজন প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরী। আত্মহত্যা করেছেন ২১ জন কিশোরী ও ২৬ জন নারী।
এমন পরিস্থিতিতে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রতিটি ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। এখানে রাজনৈতিক প্রভাব বা বাধা থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সহিংসতা রোধে এগিয়ে আসতে হবে।”
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর জানান, “নারী ও শিশু নির্যাতনের যে কোনো অভিযোগ পেলে পুলিশ তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে। পাশাপাশি আমরা নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি এবং মনিটরিং করি।”

