বাংলাদেশ রেলওয়ের বহুল আলোচিত ট্রেন ‘বিজয় এক্সপ্রেস’ এখন কার্যত যাত্রীশূন্য। এক সময় এই আন্তনগর ট্রেনটি ময়মনসিংহ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যাতায়াত করত। ২০১৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর যাত্রা শুরুর সময় এটি ছিল আশাব্যঞ্জক এক প্রকল্প। কিন্তু ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর হঠাৎ করেই ট্রেনটির যাত্রার শুরু বদলে এনে রাখা হয় জামালপুরে—এবং সেখান থেকেই শুরু হয় পতনের গল্প।
যাত্রাপথ দীর্ঘ হওয়ায় যাত্রীরাও আগ্রহ হারান। বর্তমানে এই ট্রেনের আয়ে ব্যয়ের কুল-কিনারা মেলানো যাচ্ছে না। রেলওয়ের কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন—এই পরিবর্তনের আগে কোনো ধরনের সমীক্ষা করা হয়নি। রাজনৈতিক নেতাদের আবদারেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়।
পেছনের গল্পটা বেশ পরিচিত। আগের সরকারে যেসব মন্ত্রী ও এমপি ছিলেন, তাঁদের দাবিতেই নতুন নতুন ট্রেন চালু হয়েছে, ট্রেনের গন্তব্য বর্ধিত করা হয়েছে, এমনকি স্টেশনের নামও নিজেদের আত্মীয়স্বজনদের নামে রাখা হয়েছে। যেমন সাবেক রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন তাঁর নিজের জেলা পঞ্চগড়কে রেলপথের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর সময়ে প্রায় সব আন্তনগর ট্রেনের শেষ গন্তব্য বানানো হয় পঞ্চগড়, চালু হয় নতুন ট্রেন, এমনকি ভাইয়ের নামে স্টেশনের নামকরণ পর্যন্ত।
একইভাবে প্রয়াত স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের চাপে ২০১৩ সালে সিরাজগঞ্জ শহরে ট্রেন চালু করা হয়, যদিও সেখানে উপযুক্ত অবকাঠামো ছিল না। ট্রেন যাত্রী নামিয়ে যায় ঈশ্বরদীতে, আবার সেখান থেকে ফিরে সিরাজগঞ্জে গিয়ে যাত্রী তোলে। এতে সময় এবং জ্বালানি দুই-ই অপচয় হয়।
বর্তমানে রেলওয়ে বছরে গড়ে আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি লোকসান দিচ্ছে। অথচ গত দেড় দশকে ৬৬টি নতুন আন্তনগর ট্রেন চালু হয়েছে, সঙ্গে আরও ৯২টি মেইল, লোকাল ও কমিউটার ট্রেন। এই সময়েই প্রায় ৯৮টি লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ যেসব পথে যাত্রী বেশি ছিল, সেগুলো বাদ দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দাবি পূরণে চালু হয়েছে নতুন ট্রেন।
ঢালারচর এক্সপ্রেস তার একটি বড় উদাহরণ। পাবনার ঢালারচর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণে খরচ হয়েছে ১,৭১৫ কোটি টাকা। অথচ প্রকল্পের শুরুতে যেসব আশাবাদ দেখানো হয়েছিল, তার কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। এখন দিনে মাত্র একটি জোড়া ট্রেন চলে, আয়ও হয় খুব সামান্য।
নোয়াখালীর পথে বহুদিন ধরে চলেছে উপকূল এক্সপ্রেস। এক সময় এই ট্রেন ছিল অতিরিক্ত যাত্রীতে ঠাসা—এক আসনের বিপরীতে প্রায় দ্বিগুণ যাত্রী যাতায়াত করতেন। কিন্তু বর্তমানে যাত্রীসংখ্যা অনেক কমে গেছে। কারণ সড়কপথে ভ্রমণ এখন আরও সহজ, আরামদায়ক এবং সময় সাশ্রয়ী। তবু ২০২৩ সালের শেষ দিকে আওয়ামী লীগ সরকার আরেকটি নতুন ট্রেন চালুর তোড়জোড় শুরু করে, যার নামকরণ করেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা—‘সুবর্ণচর এক্সপ্রেস’। যদিও কোচ সংকটে ট্রেনটি আর চালু হয়নি।
অবশেষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসে সিদ্ধান্ত নেয়, নোয়াখালী নয়, বরং কক্সবাজারের পথে নতুন ট্রেন চালু হবে।
উত্তরবঙ্গের পথে ট্রেনের চাহিদা অনেক বেশি। রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগ মিলে পশ্চিমাঞ্চলে প্রতিটি আন্তনগর ট্রেনে গড়ে ১১৪ শতাংশ যাত্রী যাতায়াত করে। কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস, লালমনিরহাট এক্সপ্রেস কিংবা একতা এক্সপ্রেস—সবকটিই উচ্চ যাত্রীঘনত্বের উদাহরণ। কিন্তু সমস্যা হলো, এগুলোর জন্য পর্যাপ্ত ‘রেক’ নেই। একবার যে ট্রেন যায়, সেটিকেই আবার ফিরিয়ে আনা হয়। বিকল্প ট্রেন বা কোচ না থাকায় দেরি হয়, যাত্রীদের অপেক্ষায় থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
রেলপথ মন্ত্রণালয় এখন ‘রুট রেশনালাইজেশন’ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অলাভজনক ট্রেনগুলো বন্ধ করে, লাভজনক রুটে ট্রেন বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক আবদারে চালু হওয়া ট্রেনগুলো পর্যালোচনা করে বন্ধের সুপারিশ দিচ্ছেন উপদেষ্টারা।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, “যেসব ট্রেন খরচই তুলতে পারছে না, সেগুলো ধাপে ধাপে বন্ধ করা হবে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে চালু হওয়া ট্রেনগুলোও যাচাই-বাছাই চলছে।”
বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, “রেলপথে নতুন ট্রেন চালুর আগে সমীক্ষা না করা মানেই জনসম্পদ ও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়। রেল দিয়ে আয় করতেই হবে—এমনটা না হলেও এক টাকা আয়ে আড়াই টাকা ব্যয় করলে সেটাকে উন্নয়ন বলা যায় না।”
বাংলাদেশ রেলওয়ের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ: রাজনীতির প্রভাব মুক্ত হয়ে বাস্তবতার আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া। যাত্রী চাহিদা ও আর্থিক টেকসইয়ের ভিত্তিতে রেলপথ পরিচালনা করতে না পারলে লোকসানের এই অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে আর বেরিয়ে আসা যাবে না।

