সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ভয়ংকর এক প্রবণতা মব সন্ত্রাস। প্রকাশ্যে সংঘবদ্ধ হয়ে মানুষকে মারধর, হত্যা, লুটপাট ও হেনস্তার ঘটনা যেন এখন নিত্যদিনের চিত্র হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা জনরোষের নামে যেকোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে টার্গেট করে চলছে পিটুনি, ভিডিও ধারণ ও তা ছড়িয়ে দেওয়া। থানাও রেহাই পাচ্ছে না এই মবের হাত থেকে।
গত বৃহস্পতিবার (৩ জুলাই) কুমিল্লার মুরাদনগরের বাঙ্গরা বাজার থানার আকুবপুর ইউনিয়নের কড়াইবাড়ী গ্রামে একই পরিবারের তিনজনকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে স্থানীয় জনতা। আতঙ্কে এলাকা ছেড়েছে অনেকে। এর আগে ১ জুলাই চট্টগ্রামের পটিয়ায় মব সৃষ্টি করে থানায় হামলা চালানো হয়। রাজধানীর মহাখালীতে ভিআইপি কেবিন না পেয়ে হোটেল ও বারে হামলা চালান যুবদলের বনানী থানা আহ্বায়ক মনির হোসেন ও তাঁর সহযোগীরা। লালমনিরহাটের পাটগ্রামেও একই ধরনের ঘটনায় থানায় হামলা চালিয়ে সাজাপ্রাপ্ত দুই আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ওই ঘটনায় ওসিসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন।
সাম্প্রতিক এমন ধারাবাহিক ঘটনায় গোটা দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই বিচার না করে হামলা চালানো, মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া কিংবা সামাজিকভাবে অপদস্থ করার ঘটনা বাড়ছে। রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী, চিকিৎসক, এমনকি পুলিশ বা সাধারণ মানুষ কেউই মবের রোষ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১০ মাসে দেশে ২৫৩টি মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৬৩ জন নিহত ও ৩১২ জন আহত হয়েছেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্যমতে, শুধু গত জুনেই দেশে ৪১টি গণপিটুনির ঘটনায় ১০ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩০ জনকে আহত অবস্থায় পুলিশে সোপর্দ করা হয়। বেশির ভাগ ঘটনায় ডাকাতি, চুরি, ধর্ষণ, অপহরণসহ নানা অপরাধের অভিযোগ ছিল।
অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৭৮ জন। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চার মাসে নিহত হন আরও ৭৫ জন। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর থেকে মে পর্যন্ত ৯ মাসে ২০২টি মব সন্ত্রাসের ঘটনায় ১৩১ জন নিহত ও ১৬৫ জন আহত হন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অধিকাংশ মব সন্ত্রাস ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’। প্রাথমিক অভিযোগ বা সন্দেহের ভিত্তিতে এক পক্ষ নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেও মব ব্যবহার করা হচ্ছে। থানায় হামলা কিংবা সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলছে।
এমন বাস্তবতায় সরকারের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও মব সন্ত্রাস রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা এখনো দেখা যাচ্ছে না। সম্প্রতি সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ কে এম নূরুল হুদার ওপর হামলার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “মব জাস্টিস কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেই যদি এমন ঘটনা ঘটে, তা আরও উদ্বেগজনক। তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “মব ছোঁয়াচে রোগের মতো। দমন না করলে এটি ছড়িয়ে পড়ে। এখনকার মব বেশির ভাগই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কাউকে দোষী মনে হলে আইন-আদালতের মাধ্যমেই বিচার হওয়া উচিত। আইন নিজের হাতে তুলে নিলে ন্যায়বিচার ও মানবিকতার সীমা লঙ্ঘিত হয়।”
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মব সন্ত্রাসে নিহতদের জন্য দায় কার—সেই প্রশ্ন এখন সামনে। তারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত এসব ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এবং রাজনৈতিক নেতারাও যদি এতে জড়িত থাকেন, তাদের দল থেকে বহিষ্কারসহ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

