সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আর্থিক খাতে আলোচিত একটি নাম সাউথইস্ট ব্যাংক। এক সময় দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি আজ চরম আর্থিক সংকট, স্বচ্ছতার অভাব এবং অনিয়মের ঘূর্ণাবর্তে পড়ে প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর কবির ও তার পুত্র সাবেক পরিচালক রাইয়ান কবির।
আলমগীর কবির, যিনি দুই দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার শীর্ষে থেকে একক কর্তৃত্বে পরিচালনা করেছেন এই ব্যাংক। যেখান থেকে শুরু হয়েছিল অর্থনীতির চাকা সচল রাখার অঙ্গীকার, সেখানেই এখন দৃশ্যমান অনিয়ম, স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেন এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক ব্যর্থতা। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার শীর্ষে থেকে তারা যেভাবে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অর্থপাচারে জড়িয়েছেন—তা কেবল একটি ব্যাংক নয়, গোটা আর্থিক ব্যবস্থার জন্যই হুমকিস্বরূপ।
ব্যাংকটির একজন ভুক্তভোগী গ্রাহক গত জুনে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক), বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়, আলমগীর কবির ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত একটানা ২০ বছর সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন, যা ব্যাংক কোম্পানি আইনের পরিপন্থী। তিনি শেয়ার কারসাজি, ঋণ জালিয়াতি, নারী হয়রানি, অভ্যন্তরীণ তথ্যের অপব্যবহার, প্রতিষ্ঠানকে পরিবারকেন্দ্রিক করে তোলাসহ বহু গুরুতর অপরাধে জড়িত ছিলেন।

দুদকে দেওয়া ১০ পাতার অভিযোগপত্রে বলা হয়, আলমগীর কবির দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, ১৯৯৫ সালে সাউথইস্ট ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়। কোন উদ্যোক্তা না হয়েও ২০০২ সালে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হন আলমগীর কবির। ২০০৪ সালে তিনি চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব নিয়ে ২০ বছর ছিলেন। আবার তার ছেলে রাইয়ান কবির ২০০৩ সালে ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগে চাকরিতে নিযুক্ত হন। তাকে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে পরিচালক বানিয়েছেন আলমগীর কবির। তাদের স্বেচ্ছাচারিতা, জালিয়াতি, দুর্নীতি এবং অর্থপাচারের মতো ঘটনা হাজারো গ্রাহকের আমানতকে শঙ্কায় ফেলেছে।
বিধি বহির্ভূতভাবে চেয়ারম্যানের পদে থেকে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে লুটপাট করেছেন আলমগীর। এই সময়ে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঋণ কেলেঙ্কারি, শেয়ার কারসাজিসহ বিপুল পরিমাণ অর্থপাচারের মাধ্যমে ব্যাংকটির হাজারো গ্রাহকের আমানতকে হুমকির মুখে ফেলেছেন। অনৈতিকভাবে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।
তার এসব কর্মকাণ্ড সাউথইস্ট ব্যাংকের বোর্ড সভায় পাস করিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে সভায় কম সংখ্যক এজেন্ডা আলোচনা করা হলেও পরিচালকদের উপস্থিত দেখিয়ে সবগুলো এজেন্ডা পাস দেখান। আবার এজেন্ডার শেষ দিকে ‘বিবিধ’ নামে একটা এজেন্ডা থাকে। যেখানে নিজের ইচ্ছামতো সব এজেন্ডা ঢুকিয়ে বোর্ড মিটিংয়ে পাস হওয়া মেমোতে নিজের পছন্দমতো পাতা পরিবর্তন করে নিতেন। তাতে মেমোর শর্ত, ঋণের পরিমান ও মেয়াদ পরিবর্তন করে দিতেন। এসব চলছে আলমগীর কবির ও তার ছেলের নির্দেশে।
শুধু অর্থ কেলেঙ্কারি নয়, আলমগীর কবিরের বেশ কয়েকটি নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে ব্যাংকটিতে। বিভিন্ন নারীর সঙ্গে কুরুচিপূর্ণ আলাপ ও যৌন হয়রানি করেছেন তিনি। আলমগীর কবির পছন্দমাফিক কতিপয় অধস্তন নারী কর্মকর্তাদের নিজ অফিসে ডেকে নিয়ে যেতেন। কখনোবা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় একান্ত সময় কাটাতেন। কতিপয় নারী সদস্যকে বাধ্য করতেন যৌন সম্পর্কে জড়াতে। আলমগীর কবির বছরের পর বছর এমন অনেক নারীর সঙ্গে অবৈধ যৌন সম্পর্কে জড়ানোর নেশায় মেতেছিলেন। আবার কিছু নারী কর্মকর্তাও পদোন্নতি, অর্থবিত্ত আর অবৈধ প্রভাব বিস্তারের নেশায় তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতেন।
আলমগীর কবির সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় তার ফ্লোরে ছিলো সুন্দরী নারীদের আনাগোনা। তিনি একাধিক সুন্দরী নারীকে এপিএস বানিয়েছেন। অনেক নারীকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন। তাকে নারী সরবরাহ করতেন একটি দালাল চক্র। যারা নারীর বিনিময়ে তার কাছ থেকে বাগিয়ে নিয়েছেন বড় বড় লোন।
আলমগীর কবির সাউথইস্ট ব্যাংক পরিচালিত গ্রীন স্কুল ও বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডে তার কয়েকজন সখের নারীকে চাকরি দিয়েছেন। নারী লিপ্সু আলমগীর কবির একটা সময় অর্থের পাশাপাশি যৌন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছেন। বয়সের ভারে নুজ্য আলমগীর কবির সবসময় বুদ থাকতেন নারীতে।
আলমগীর কবির দ্বারা নির্যাতিত একাধিক নারী এই বিষয়ে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ বেশ কয়েকজনের কাছে তার সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালক পদ বাতিলের জন্যও আবেদন করবেন বলে জানা গেছে।
২০০৪ সাল থেকে বিরতিহীনভাবে টানা দুই দশক অনিয়ম-লুটপাট-অর্থপাচারের রাজত্ব কায়েম করেছেন তিনি। আলমগীর কবির একক আধিপত্য দেখিয়ে নিজস্ব লোকদের ঋণ দেওয়া, চলতি ঋণের সুদ মওকুফ করে দেওয়া এবং নামে-বেনামে ঋণ দিয়েছেন। এমনকি বিভিন্ন সময়ে অন্যান্য পরিচালকরা আপত্তি করলেও বিশেষ সুবিধা নিয়ে একক ক্ষমতায় অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ঋণ অনুমোদন করেছেন।
অবশ্য শুধু ঋণ নয়, ব্যাংকের সরঞ্জামাদি ক্রয়, শাখা সম্প্রসারণ, শাখার ইন্টেরিয়র, ব্যাংকের বুথ বসানো থেকে শুরু করে সফটওয়্যার সরবরাহসহ সব ক্ষেত্রেই ছিল কর্তৃত্ব। আর এভাবেই ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছেন এই ব্যাংক মাফিয়া। যা দিয়ে দেশে-বিদেশে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। অর্থ পাচারের মাধ্যমে বিদেশে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় বিলাসবহুল বাড়ি, হোটেল ও বার রয়েছে তার। দেশের ভেতরেও গুলশান, বসুন্ধরা ও বাংলামোটরে একাধিক ফ্ল্যাট; গাজীপুরে বাড়ি, শ্রীপুর-ভাওয়াল এবং কাঁচপুরে শত শত বিঘা জমি আছে তাদের।
এদিকে অনিয়ম-লুটপাটের এখানেই শেষ নয়, চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় এবং ছেলে রাইয়ান কবির ব্যাংকের পরিচালক থাকাকালীন বাপ-বেটা ব্যাংক থেকে লুটপাট করে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স, বে লিজিং এবং এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের বিপুল পরিমাণ শেয়ার ক্রয় করেন। লক্ষ্য ছিল ব্যাংকের টাকায় শেয়ার কিনে ওই সব প্রতিষ্ঠান দখল করা। ওই সব প্রতিষ্ঠানের কোথাও পরিচালক আবার কোথাও উপদেষ্টার পদ দখল করেছেন আলমগীর কবির। এমনকি নিজস্ব দু’টি প্রতিষ্ঠানের নামে অনৈতিকভাবে মোটা অঙ্কের ঋণও অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন। যা নিয়ে এখন বিপাকে পড়েছে ব্যাংক।
সাউথইস্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, গত দুই দশক ধরে সবকিছুই আলমগীর কবিরের ইশারায় পরিচালিত হয়েছে। বাছবিচার ছাড়াই ব্যাংকের টাকা তিনি কখনো পারিবারিক প্রতিষ্ঠান, কখনো বিশেষ সুবিধা নিয়ে নামে-বেনামে ঋণ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছেন ব্যাংকের পরিষদে থাকা তার কতিপয় বন্ধু। আর অনিয়ম-দুর্নীতিতে দুর্বল হয়ে পড়া ওই সব প্রতিষ্ঠান এখন আর টাকা ফেরত দিতে পারছে না। যার ফলে বিপাকে পড়েছে দেশের স্বনামধন্য ও র্যাংকিংয়ে শীর্ষে থাকা এই ব্যাংকটি। যদিও কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের যোগ্য নেতৃত্বে আবারও ঘুড়ে দাঁড়াবে সাউথইস্ট ব্যাংক।
এদিকে শেয়ার কারসাজির হোতা হিসেবে পরিচিত আলমগীর কবিরের রয়েছে একটি সিন্ডিকেট। এতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের একাধিক পরিচালকও জড়িত রয়েছেন। হাজার হাজার গ্রাহক শেয়ার কারসাজির সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে পথে বসেছে। এমনকি ছাত্র-জনতার বিপ্লবে স্বৈরাচার হাসিনার ভারতে পলায়নের পর ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা এই চক্রটির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে অভিযোগও দিয়েছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শেয়ারবাজারের ভেতরের তথ্যের অপব্যবহার (Insider Trading)। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) এক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে আরও গুরুতর তথ্য। ২০২২ সালে বে লিজিং লোকসানে যাচ্ছে, এরকম সংবেদনশীল তথ্য আগাম জেনে শেয়ার বিক্রি করে দেন আলমগীর কবির। বিষয়টি তদন্তে ধরা পড়ার পর গত ১৯ নভেম্বর বিএসইসি তাকে ১২ কোটি টাকা, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগমকে ৫ কোটি এবং তুষার এল কে মিয়াকে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই ঘটনাটি দেশের পুঁজিবাজারের অভ্যন্তরীণ তথ্যের অপব্যবহারের জ্বলন্ত উদাহরণ।
একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে তার নিকটাত্মীয় (বেয়াই) এর প্রতিষ্ঠান লুব-রেফ বাংলাদেশ এ তার অনৈতিক কারসাজি, যেখানে তিনি বেআইনিভাবে ৫৪ কোটি টাকার অধিক ঋণ সুদসহ মওকুফ করে দিয়েছেন। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, তিনি দুই যুগের বেশি সময় চেয়ারম্যান থাকাকালীন স্বৈরাচার হাসিনার কোষাগারে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন। মোটকথা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সাউথ ইস্ট ব্যাংককে খাদের কিনারে নিয়ে গেছেন আলমগীর কবির।
আবার, একটি গুরুতর অভিযোগ এসেছে বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড নামে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ২৩২ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া নিয়ে, যার পরিচালনায় ছিলেন আলমগীর কবিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। আলমগীর কবিরের সময়ে অনিয়মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে দেওয়ার ঋণ ২৩২ কোটি টাকা ফেরত দিচ্ছে না আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। ব্যাংকের মূল কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যাংকটির ফাউন্ডেশন ও গ্রিন স্কুলের তহবিলও প্রতিষ্ঠানটিতে আটকা পড়েছে। মেয়াদি আমানত ও কলমানি হিসেবে এই অর্থ ধার দিয়েছিল ব্যাংকটি। টাকা ফেরত চেয়ে বারবার চিঠি দেয়া হলেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি থেকে কোনো সাড়া মিলছে না। মূল অর্থের পাশাপাশি সুদও পরিশোধ করছে না বলে সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে জানানো হয়।
এই লেনদেন সরাসরি স্বার্থসংশ্লিষ্ট হওয়ায় তা ব্যাংক কোম্পানি আইন পরিপন্থী। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের তদন্তে বেরিয়ে আসে, প্রতিষ্ঠানটি কার্যত দেউলিয়া এবং ঋণ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ২০২৩ সালের শেষে বে লিজিংয়ের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৫১ কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৬৬ শতাংশ।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ভয়াবহ আর্থিক সংকটে ছিল। সেই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৭২ কোটি টাকা। শুধু ওই বছরেই তাদের নিট লোকসান হয়েছে ৮৪ কোটি টাকা, যা তার বিগত বছর ২০২২ সালের ৮২ কোটি টাকার লোকসানের চেয়েও বেশি।
অর্থাৎ টানা দুই বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি বিপুল অঙ্কের ক্ষতির মুখে পড়ে। এছাড়া ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বে লিজিংয়ের বিতরণ করা ঋণের মধ্যে প্রায় ৫৫১ কোটি টাকা পরিশোধ হয়নি, যা মোট ঋণের ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া প্রতি তিন টাকার মধ্যে প্রায় দুই টাকাই এখনো খেলাপি।
বে লিজিং মূলতঃ আলমগীর কবিরের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া গত সেপ্টেম্বরে পরিষদ পুনর্গঠনের আগ পর্যন্ত বে লিজিংয়ের প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান খানও সাউথইস্ট ব্যাংকের পর্ষদে ছিলেন। আবার প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান মাসুদা গণি সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালক নাসির উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ-৪-এর এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, এই মুহূর্তে সাউথইস্ট ব্যাংকের পাওনা টাকা পরিশোধ করার সক্ষমতা বে লিজিংয়ের নেই। প্রতিষ্ঠানটিকে টাকা ধার দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ এর ২৭ (১-খ) ধারা লঙ্ঘন করেছে সাউথইস্ট ব্যাংক। ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রুগ্ন এই প্রতিষ্ঠানের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ছিল ১৭২ কোটি টাকা। আলমগীর কবিরের ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান সুরাইয়া বেগম তার স্ত্রী। সে হিসাবে ব্যাংকের সঙ্গে বে লিজিংয়ের লেনদেন ‘ব্যাংকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে লেনদেন’ বলে গণ্য হবে।
উল্লেখ্য, ২০০৪ থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ২০ বছর সাইথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন যে আলমগীর কবির, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনিই ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদ ছাড়তে বাধ্য হন। ২৯ সেপ্টেম্বর তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বর্তমানে নতুন চেয়ারম্যান হয়েছেন এম এ কাশেম। তবে এতো অনিয়মের পরেও পরিচালক হিসেবে এখনো সাবেক এই চেয়ারম্যান সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিষদে রয়েছেন।
কিন্তু দুর্নীতি এখানেই শেষ নয়, সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক পরিচালক আলমগীর কবিরের ছেলে রাইয়ান কবিরের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিয়েছেন ব্যাংকের একজন গ্রাহক। দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, নিয়ম বহির্ভূতভাবে পরিচালকের পদ আঁকড়ে রেখেছেন তিনি। এরই মধ্যে রাইয়ান কবিরের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকে অনেক অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ২০২২ সালের ৩১ মে তাকে পর্ষদ থেকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ছেলে রাইয়ান কবির ২০০৩ সালে সাউথইস্ট ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগে চাকরিতে নিযুক্ত হন। তাকে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে পরিচালক বানিয়েছেন আলমগীর কবির। তাদের স্বেচ্ছাচারিতা, জালিয়াতি, দুর্নীতি এবং অর্থপাচারের মতো ঘটনা হাজারো গ্রাহকের আমানতকে শঙ্কায় ফেলেছে।
আইন অনুযায়ী পরিচালক বিএলআই শুধুমাত্র ১৩ দশমিক ৫ কোটি টাকা ঋণ পাওয়ার যোগ্য। অথচ বিএলআই প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা ভোগ করেছে। পাঁচ বছরে ঋণের বিপরীতে সুদ দিতে হবে না গ্রাহককে, এই বলে গ্রাহকের মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেন আলমগীর। তারপরও ওই ঋণের সুদ মুক্ত ব্লকড অ্যাকাউন্টে দিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে তিনি বিভিন্ন কোম্পানি যেমন জাজ ভূঁইয়াকে ৩০০ কোটি টাকা, সুয়াদ গার্মেন্টকে ১৫ কোটি, ফাহমী নিটকে ৩০০ কোটি টাকা, কেয়া গ্রুপকে ৯০০ কোটি টাকা, মাহাবুব স্পিনিংকে ১৫০ কোটি টাকার ঋণ দিয়ে লিমিট ক্রাস করেছেন। তবে এই কারসাজির মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে তিনি শত কোটি টাকা কমিশন নিয়েছেন বলে দাবি পর্ষদ সদস্যদের।
এছাড়া রাইয়ান কবির সিঙ্গাপুরে আর অ্যান্ড এন ট্রেড হোল্ডিং, ই-এক্সচেঞ্জ সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লি. এবং আর অ্যান্ড এন মেরিন অ্যান্ড শিপ ট্রেড প্রাইভেট লি. নামের তিনটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে প্রায় ২০ কোটি টাকার অধিক অর্থ শেয়ার মানি ইকুইটি হিসেবে বিনিয়োগ করেছেন। প্রতি বছর বিভিন্ন উপায়ে দেশ থেকে অর্থ পাচার করে কোম্পানিগুলোর নেট ইক্যুইটি বৃদ্ধি করছেন। যা রাইয়ান কবিরের আয় হিসেবে ঘোষণা নেই। বৈধ উৎসবিহীন এত বড় অঙ্কের অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) অনুমতি ছাড়া অবৈধ পন্থার বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
ব্যাংকের দুর্নীতি অনিয়মের বিরুদ্ধে আদালতে দায়ের করা অভিযোগ পত্রে গ্রাহক উল্লেখ করেন, আলমগীর কবিরের পরিবার নিয়ন্ত্রিত বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড (বিএলআই) থেকে ২০২০ সালের ১৫ অক্টোবরে মুনিরুজ্জামান সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালক হন। তার আগে সাউথইস্ট ব্যাংকে বিএলআই’র কোনও ঋণ ছিল না। ওই বছরের ২৪ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক এনওসি দেয়। কিন্তু সে সময় সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে ২১০ কোটি টাকা ঋণ ছিল বিএলআই ক্যাপিটাল লি. এর, যা গুরুতর অপরাধ।
ব্যাংকের কল মানির ১৩০০ কোটি টাকা থেকে শুধু বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড (বিএলআই) ঋণ পায়। অথচ বিএলআই-এর বর্তমানে মোট প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ঋণ সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটে দেখানো হয়নি বলেও অভিযোগ পর্ষদের। যা ব্যাংকিং খাতে গুরুতর অপরাধ। বিএলআই-কে আরও ১২ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়।
আবার এদিকে নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো রাইয়ান কবির নতুন করে সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালক হতে দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন। তিনি পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করেছেন। ২০২৫ সালের মার্চের ১১ তারিখে এই আবেদন করেন। এই অবস্থায় তাকে পুনরায় পরিচালক পদে নিয়োগ দিলে ব্যাংকটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে। তাই তাকে যেন বাংলাদেশ ব্যাংক দায়মুক্তি না দেয়, সেজন্য গভর্নর, দুদক চেয়ারম্যান, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান ও এনবিআরের চেয়ারম্যানের সুদৃষ্টিও কামনা করা হয় মামলার আবেদনে।
এই কেলেঙ্কারি শুধু একটি ব্যাংকের নয় বরং বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রণহীনতা, ‘চেয়ারম্যানতন্ত্র’ এবং স্বজনপ্রীতির চরম প্রতিফলন। অর্থনীতির কেন্দ্রে থাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থা যদি এমনভাবে এক ব্যক্তির ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাই বিপন্ন হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা আবারও প্রমাণ করে, যে কোনো প্রতিষ্ঠানের টেকসইতা নির্ভর করে এর অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্রিয় ভূমিকার উপর।
সাউথইস্ট ব্যাংকের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়, একটি প্রতিষ্ঠানে কতদিন, কত ক্ষমতা এবং কতটা স্বাধীনতা একজন ব্যক্তিকে দেওয়া উচিত? রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, না হলে যে ধ্বংস আমরা আজ দেখছি, আগামীকাল হয়তো তা আরও বিস্তৃত আকারে ফিরে আসতে পারে।

