প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা খরচে নির্মিত হলেও বছরের পর বছর বন্ধ থেকেছে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে অবস্থিত শাহজালাল সার কারখানা। কখনো গ্যাসের অভাব, কখনো যন্ত্রপাতির ত্রুটি, আবার কখনো কোনো কারণই জানেন না কর্তৃপক্ষ। কাগজে-কলমে সব ঠিক থাকলেও বাস্তবে এই ‘মেগা প্রকল্প’ এখন ‘মেগা ব্যর্থতা’র উদাহরণ।
দেশের অন্যতম ব্যয়বহুল এই সার কারখানাটি দীর্ঘ এক হাজার সাত দিন বন্ধ ছিল। এর মধ্যে শুধু গ্যাসের সংকটেই কারখানার উৎপাদন ৩২০ দিন বন্ধ ছিল। অথচ প্রকল্প পরিকল্পনায় এ ধরনের জটিলতার আশঙ্কা ছিল না। সম্প্রতি প্রকল্পটির প্রভাব মূল্যায়ন করেছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) অধীনে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থা’। তারা পর্যায়ক্রমে যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের প্রযুক্তিনির্ভর গ্যাস টারবাইন সিস্টেমে চালু হয় শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (এসএফসিএল)। কিন্তু বিসিআইসির (বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন) প্রকৌশলীরা এই প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত ছিলেন না। ফলে ঘন ঘন সিস্টেম ট্রিপ করত এবং উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেত। এই সমস্যার সমাধান হতে পারত স্টিম টারবাইন ব্যবহারে, যেখানে বিসিআইসির অন্যান্য কারখানার জনবল দক্ষ। কিন্তু পরিকল্পনায় তা অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
কারখানায় ব্যবহৃত হয়েছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের যন্ত্রাংশ, কন্ট্রোল সিস্টেম ও সফটওয়্যার, যা রক্ষণাবেক্ষণে জটিলতা তৈরি করেছে। একটি যন্ত্র বিকল হলে নতুন যন্ত্র আমদানিতে অনুমোদন, দরপত্র এবং ডলার সংগ্রহসহ পেছনে পড়ে যায় সপ্তাহ বা মাস। এর মধ্যে উৎপাদন বন্ধই থাকে। সফটওয়্যার ব্যবস্থায়ও জটিলতা রয়েছে। ডিএসসি, পিএলসি, উডওয়ার্ড কন্ট্রোলার ও ডিজিটাল হাইড্রোলিক সিস্টেম একসঙ্গে ব্যবহারের ফলে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। একে অপরের সঙ্গে কাজ না করায় ট্রিপ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
জেটি নির্মাণে বরাদ্দ ছিল ৭৬ কোটি টাকা। কিন্তু বিআইডব্লিউটিএর অনুমতি না থাকায় গ্যাংওয়ে ও পন্টুন নির্মাণ সম্ভব হয়নি। পরে সংশোধিত কার্যাদেশে সাত কোটি টাকা কমানো হলেও জেটিটি আজও কার্যকরভাবে ব্যবহার হয়নি। পানি সরবরাহে ব্যবহৃত আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপলাইনে ছিল না ক্যাথোডিক প্রটেকশন। ফলে পাইপ লিকেজ হয়, পানি অপচয় হয় এবং কেমিক্যাল ভারসাম্য নষ্ট হয়ে উৎপাদনে বাধা তৈরি হয়। বয়লার সিস্টেমেও ছিল পরিকল্পনার ঘাটতি। কারখানা সচল রাখতে ঘণ্টায় ১৫০ টন স্টিম প্রয়োজন, কিন্তু দুটি বয়লারে মাত্রাতিরিক্ত চাপ পড়ছে। একটি বয়লারে সমস্যা হলে পুরো প্লান্ট থেমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কারখানায় প্রয়োজন ১৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কিন্তু স্থাপিত পাওয়ার প্লান্ট সে সক্ষমতা রাখে না। দুটি টার্বো জেনারেটর একটানা চালু রাখতে হয়, যা ব্যয় বাড়ায়। অথচ ৮০৩-২৪ ধরনের জেনারেটর ব্যবহার করলে একটি রিজার্ভ রাখা যেত এবং অপারেশন হতো নিরবচ্ছিন্ন। অ্যামোনিয়া, ইউরিয়া ও ইউটিলিটি—তিনটি ইউনিটের জন্য রয়েছে আলাদা কন্ট্রোলরুম। এতে ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব হয় এবং ব্যয় বেড়ে যায়। একটি একীভূত কন্ট্রোলরুম হলে খরচ হ্রাস ও কার্যকারিতা বাড়ানো যেত।
এই অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার বিষয়ে আইএমইডি সচিব মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘এই প্রকল্পের পর্যবেক্ষণগুলো আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। তারাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

