গ্রামীণ জনপদের হতদরিদ্র মানুষের জন্য নির্মিত টুইন পিট ল্যাট্রিন, পাবলিক টয়লেট ও হাত ধোয়ার স্টেশনে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের উপকরণ। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অনেক অবকাঠামো হয়ে পড়েছে অকেজো। অনেক জায়গায় এসব স্থাপনাকে ইতিমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে পরিত্যক্ত। পানি সরবরাহের জন্য পাইপলাইন বসানো হয়েছে নকশাবহির্ভূতভাবে, ব্যবহৃত হয়েছে মানহীন সরঞ্জাম। এমনকি পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়াই জলাশয় ভরাট করে পাইপ বসানো হয়েছে। অন্যদিকে, ঠিকাদারদের বিল যাচাই না করেই করা হয়েছে অর্থ পরিশোধ। কাজের মান পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন দিতেও বাধা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প ঘিরে এমন অনিয়ম যেন সব সীমা ছাড়িয়েছে।
‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি’ প্রকল্পে এমন দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাম্প্রতিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে। ৩০টি জেলায় বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণের অর্থে নিম্নমানের কাজ করে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজেরাই লাভবান হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) অর্থায়নে প্রায় ১ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ১ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)। তবে কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই শুরু করা এ প্রকল্প এখন পরিণত হয়েছে ব্যর্থতা ও দুর্নীতির উদাহরণে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের পর ২০২১ সালের জানুয়ারিতে কাজ শুরু হয়। বাস্তবায়নের মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৪৬ শতাংশ। এরই মধ্যে যেসব অবকাঠামো হয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই নষ্ট, ব্যবহার অনুপযোগী বা পরিত্যক্ত।
আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, অনেক জেলায় টয়লেটের টাইলস ভেঙে গেছে, দরজার কাঠামো ভঙ্গুর, ফিটিংস অকেজো। দরিদ্রদের জন্য তৈরি টুইন পিট ল্যাট্রিনে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের কাঠ। হাত ধোয়ার স্টেশনগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য নির্মিত টয়লেটগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ক্লিনিক থেকে দূরে, এমনকি ডোবার পাশে হওয়ায় ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। পাইপলাইন স্থাপনেও অনিয়ম স্পষ্ট। নকশা অনুযায়ী কোথাও সঠিকভাবে পাইপ বসানো হয়নি। মাটির নিচে তিন ফুট বসানোর কথা থাকলেও কোথাও তিন ইঞ্চি, কোথাও ছয় ইঞ্চি নিচে বসানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় বালুও দেওয়া হয়নি, আবার নিম্নমানের কয়েল পাইপ ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, অনেক জায়গায় ‘প্রতিবন্ধীবান্ধব’ টয়লেট বানানো হলেও বাস্তবে সেগুলোতে হুইলচেয়ার নিয়ে প্রবেশই সম্ভব নয়। র্যাম্প অতিরিক্ত উঁচু হওয়ায় প্রতিবন্ধীরা তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষও যেতে পারেন না। দরজা ও প্রবেশপথ সঠিকভাবে তৈরি হয়নি। কিছু জায়গায় সাপোর্টিং হ্যান্ডেল পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।
জেলা সমন্বয়কারীদের কাজের অনিয়ম চিহ্নিত করে প্রতিবেদন দিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। বরং তাদের বলা হয়েছে ভবিষ্যতে নেতিবাচক প্রতিবেদন না দিতে। ঠিকাদারদের বিল যাচাইয়ের অধিকার থাকলেও কার্যত তা প্রয়োগ করতে দেওয়া হয়নি। ফলে যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিল পরিশোধ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক নিজেই এসব অনিয়মে সহযোগিতা করেছেন।
অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদার বলেন, ‘আইএমইডির প্রতিবেদন আংশিক। সব জেলায় সমস্যা হয়নি। কিছু জেলার ভিত্তিতে পুরো প্রকল্পকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।’ নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি কারও প্রতিবেদন দেওয়ায় বাধা দেইনি। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশিরভাগ জেলায় ছোট পানির স্কিম ও পাবলিক টয়লেটের গুণগতমান নিম্নমানের। অনেক জায়গায় ল্যান্ডিং স্টেশন ভেঙে গেছে, মেঝে বসে গেছে, টাইলস উঠে গেছে, বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। হুইলচেয়ার চলাচল অসম্ভব হওয়ায় ‘প্রতিবন্ধীবান্ধব’ টয়লেটগুলো ব্যবহার হচ্ছে না। নারীদের জন্য তৈরি টয়লেট কখনো ব্যবহৃতই হয়নি। হাত ধোয়ার স্টেশনগুলো প্রায় সবই অকেজো। ফিটিংস ভাঙা বা চুরি গেছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্মিত স্টেশনগুলোতেও প্রবেশের ব্যবস্থা নেই।
বাড়িতে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও সেটিও অনিয়মে ভরা। পাইপ বসানো হয়েছে নিয়ম না মেনে, বালু দেওয়া হয়নি যথাযথভাবে, ব্যবহৃত উপকরণ মানহীন। অনেক জায়গায় জলাশয় ভরাট করে পাইপ বসানো হলেও পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এসব অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যাবে, অপচয় হবে সরকারি অর্থের। তাই অনিয়মের ক্ষতিপূরণ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। জেলা সমন্বয়কারীদের যথাযথ দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করার সুপারিশও করা হয়েছে।

