স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিস্তৃত অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ দুই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা—স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও ঢাকা ওয়াসা। এই দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ছিল তাঁর একটি ‘নিবন্ধিত’ সম্পর্ক। মাসিক ভিত্তিতে চলত ঘুষ লেনদেন। আর বিনিময়ে মন্ত্রী হস্তক্ষেপ করতেন না সংস্থাগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রমে।
এলজিইডির স্বাধীনতা মানেই ঘুষের চুক্তি
সড়ক, সেতু ও গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এলজিইডি একসময় ছিল একটি প্রশংসিত প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তাজুল ইসলাম ২০১৮ সালে মন্ত্রী হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে রূপ নেয় দুর্নীতির দুর্গে।
প্রথমদিকে তিনি প্রকল্পে হস্তক্ষেপ করতেন। পিএস-এপিএসের মাধ্যমে চলত তদবির। পরে এলজিইডির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে একপ্রকার চুক্তিতে পৌঁছান। চুক্তি অনুযায়ী, মন্ত্রী যা চাইবেন, সেটাই পাবেন। আর মন্ত্রী হস্তক্ষেপ বন্ধ করবেন।
এরপর থেকে এলজিইডি হয়ে ওঠে তাজুল ইসলামের ব্যক্তিগত দফতর। তাঁর জনসভা, বিদেশ সফর, এমনকি ব্যক্তিগত বাসা-বাড়ি নির্মাণের খরচও বহন করত এলজিইডি। তিনি প্রতি মাসে ঘুষ হিসেবে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থও পেতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তাজুল ও তাঁর পরিবারের জন্য এলজিইডি বরাদ্দ দেয় ১২টি গাড়ি। চালক, তেল, রক্ষণাবেক্ষণ—সব খরচ এলজিইডির। এমনকি তাঁর বাবুর্চির বাজার করার জন্য বরাদ্দ ছিল একটি পাজেরো।
২০১৮, ২০১৯ ও ২০২১ সালে উন্নত চিকিৎসার জন্য ছয়বার সিঙ্গাপুরে যান মন্ত্রী। প্রতিবারই চিকিৎসা ব্যয়ের পুরোটা এলজিইডি বহন করে। আর মজার বিষয় হলো, প্রতিবার তাঁর সফরের পরদিনই প্রধান প্রকৌশলীও ‘অফিশিয়াল ভিজিট’-এর নামে সিঙ্গাপুরে যেতেন। বিল পরিশোধ করতেন তিনিই।
প্রতিষ্ঠানে নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে তাজুল ইসলাম পছন্দের ব্যক্তিদের প্রধান প্রকৌশলী পদে বসাতেন। অভিযোগ আছে, সর্বশেষ আলী আক্তার হোসেনকে প্রধান প্রকৌশলী বানাতে ১০ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন তাজুল।
এলজিইডির সম্মেলন কক্ষ ব্যবহার হতো মন্ত্রীর আত্মীয়-স্বজনের অনুষ্ঠান আয়োজনে। তাঁর স্ত্রীর নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে কেনা জমির উন্নয়ন, রাস্তা নির্মাণ ও চট্টগ্রামে বাড়ি তৈরির খরচও বহন করে এলজিইডি।
তাজুল নিজেই ঘনিষ্ঠদের বলতেন, “এলজিইডি আছে বলেই মন্ত্রণালয়ে আমার কোনো খরচ নেই। সবই ওরাই বহন করে।” এই সুযোগেই এলজিইডিকে বানানো হয় ‘সোনার খনি’। আর সংস্থাটি দিনে দিনে পরিণত হয় এক দুর্নীতির ধ্বংসস্তূপে।
ওয়াসা: মার্কিন বাড়ির বিনিময়ে নীরব সমঝোতা
তাজুল ইসলামের আগ্রহ ছিল ওয়াসাতেও। কিন্তু ওয়াসার রাজা ছিলেন তাকসিম এ খান। ২০০৯ সালে একক সিদ্ধান্তে তাকসিমকে এমডি বানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর একযুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি জোর করে এমডি পদে বহাল থাকেন।
তাজুল ইসলাম সরাসরি বিরোধে না গিয়ে চতুর পথ বেছে নেন। ডেকে নেন তাকসিমকে, করেন সমঝোতা। সেই সমঝোতার বিনিময়ে ওয়াসার কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করেননি তাজুল। বিনিময়ে পান ‘উপহার‘।
তাকসিম মার্কিন নাগরিক হওয়ায় তাজুল তাঁকে অনুরোধ করেন—যুক্তরাষ্ট্রে কিছু সম্পদ কেনার জন্য। ফলাফল—নিউইয়র্ক ও ফ্লোরিডায় তিনটি বাড়ি। সবগুলো কেনা হয় তাকসিম খানের তত্ত্বাবধানে। পাশাপাশি, কানাডায় স্ত্রী-সন্তানদের জন্যও বাড়ি কিনে দেন তাকসিম।
ওয়াসার যেকোনো ফাইল গেলেই দ্রুত স্বাক্ষর করতেন তাজুল। কারণ, ‘বিনিয়োগের বিনিময়ে’ এসব ফাইলেই ছিল লাভের গন্ধ।
এভাবেই তাকসিম হয়ে ওঠেন তাজুলের আন্তর্জাতিক সম্পদ ব্যবস্থাপক। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, দুবাই—সবখানে বিনিয়োগ ও সম্পদ কেনায় ছিল তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা। এমনকি ওয়াসার চেয়ারম্যান যদি কোনো কথা বলতেন তাকসিমের বিরুদ্ধে, তাকেই সরিয়ে দিতেন মন্ত্রী।
বিদেশি সম্পদের খোঁজ কে নেবে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে তাজুল ইসলামের নামে সম্পত্তি জব্দ করা হলেও তাঁর বিদেশি সম্পদের ব্যাপারে সরকার নিরব। বিদেশে বাড়ি, জমি ও বিনিয়োগের কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি। অথচ এসব সম্পদেই প্রতিফলিত হচ্ছে দুর্নীতির আসল চেহারা।
তাজুল ইসলাম শুধু একটি সংস্থাকেই নয়, দুটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানকেই ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। আর দুর্নীতিকে দিয়েছেন একটি নতুন রূপ—কৌশলী চুক্তি, মাসিক সুবিধা আর বিদেশি উপঢৌকনের ভয়ংকর সমন্বয়।

