দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালকদের নেওয়া ঋণ মাত্র চার মাসে কমেছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। অথচ গত আগস্ট শেষে এটি ছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার ১২৩ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতে প্রভাবশালী কিছু গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পাওয়ায় তাদের অধীন পরিচালকরাও বাদ পড়েছেন। এরই প্রভাবে পরিচালকদের ঋণ কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন ইঙ্গিতই মিলেছে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বহুদিন ধরেই পরিচালকরা সমঝোতার মাধ্যমে একে অপরের ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজ ব্যাংক থেকে পরিচালকের ঋণ নেওয়ার বিষয়ে কঠোর আইন করলেও, পরিচালকরা পরস্পরের মাধ্যমে নিয়মকে পাশ কাটিয়ে অন্য ব্যাংক থেকে সুবিধা নিয়েছেন। এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংকের পরিচালককে সুবিধা দিয়ে পাল্টা সুবিধা নিয়েছেন। এভাবেই মিলেমিশে লুটপাটে নেমেছেন অনেকে।
২০২০ সালে পরিচালকদের মোট ঋণ ছিল ২ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা। অথচ ২০১৬ সালে এটি ছিল মাত্র ৯০ হাজার কোটি টাকা। এস আলম গ্রুপ ব্যাংক খাতে প্রবেশের পর মাত্র আট বছরে এই ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটিতে। এই সময়ে পরিচালকদের ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৬০ শতাংশ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের প্রায় সাড়ে ৭০০ ব্যাংক পরিচালকের মধ্যে বড় অঙ্কের অনিয়মে জড়িত ছিলেন মাত্র একশ’জন। এরা এস আলম, বেক্সিমকো, নাসাসহ ১১টি গ্রুপের হয়ে কাজ করতেন। তবে গত আগস্টের পর এসব গ্রুপের প্রভাব কমে গেলে পরিচালনা পর্ষদ থেকেও তারা বাদ পড়েন। ফলে মাত্র চার মাসে ঋণ কমে ৬০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামনে এই ঋণ আরও কমতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শেয়ারহোল্ডার পরিচালকদের হিসাব অন্তর্ভুক্ত করলে পরিচালকদের ঋণের প্রকৃত অঙ্ক দাঁড়াতে পারে ৫ লাখ কোটি টাকার বেশি।
নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ঋণ গেছে ইসলামী ব্যাংক থেকে। এ ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ও বেক্সিমকো নিয়ন্ত্রিত পরিচালকদের ঋণ ১০ হাজার কোটি করে। সাউথইস্ট ব্যাংকে পরিচালকদের ঋণ ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, এসব গ্রুপ রাজনৈতিক সংযোগ এবং আইনের ফাঁক গলিয়ে আর্থিক খাতকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। আটটি ব্যাংকের জড়িত পরিচালকরা যৌথভাবে পরিশোধিত মূলধন দিয়েছেন মাত্র ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, অথচ একে অপরের ব্যাংক থেকে নিয়েছেন ৪৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ঋণের তুলনায় তাদের মূলধন মাত্র ৫ শতাংশ। বিশেষ করে বেক্সিমকোর চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান এবং নাসা গ্রুপের নজরুল ইসলাম মজুমদার এই অনিয়মের প্রধান চরিত্র বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘পরিচালকদের ঋণের বিষয়ে ব্যাংক কোম্পানি আইনে দুর্বলতা আছে। এজন্যই তারা একে অপরের সঙ্গে মিলে ঋণ বের করেছেন। ভবিষ্যতে যেন এমনটা না হয়, সেই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’ ২০১৪ সালের এক নির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, পরিচালকদের নিজ নিজ ব্যাংক থেকে পরিশোধিত মূলধনের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেওয়া যাবে। তবে বাস্তবে এই সীমা বহু আগেই ভেঙে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘আগস্টের আগে ব্যাংক খাতে যা ঘটেছে, তা কারও অজানা নয়। কয়েকটি গ্রুপ পুরো ব্যাংক খাতকেই দেউলিয়া করে ফেলেছিল। এখন সবকিছু স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করে যাচ্ছে। আমরা আশাবাদী, সামনে ভালো কিছু ঘটবে।’

