চট্টগ্রামের নগরবাসীর জন্য একটিমাত্র নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা- বিপ্লব উদ্যান। ষোলশহর ২ নম্বর গেটের এ সবুজ খণ্ডটি একসময় ছিল প্রাণের উদ্যান, অথচ আজ সেটি উন্নয়নের নামে বাণিজ্যিক আগ্রাসনের শিকার। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে- এ উদ্যান কি আদৌ টিকে থাকবে?
বিপ্লব উদ্যানের ওপর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নীতিহীনতা নতুন কিছু নয়। ক্ষমতাসীন বিগত সরকারের দুই মেয়র উদ্যানটিকে ইজারা দিয়ে বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করেন।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়িত্ব নেওয়া বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনও সেই ধারার ব্যতিক্রম ঘটাননি। উল্টো সম্প্রতি একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন চুক্তির মাধ্যমে উদ্যানে চারতলা পর্যন্ত স্থাপনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যেখানে দ্বিতীয় তলায় আরবান লাউঞ্জ, তৃতীয় তলায় ইনডোর গেমসের কফি শপ এবং চতুর্থ তলায় মুক্তিযুদ্ধ ও চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রদর্শনী কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই ‘উন্নয়ন’ কার্যত নগরবাসীর স্পষ্ট গণমতের পরিপন্থী। গত বছরের ৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নিজস্ব আয়োজিত গণশুনানিতে নগরবাসী ও নগর পরিকল্পনাবিদরা পরিষ্কারভাবে বিপ্লব উদ্যানে কোনো স্থাপনা বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ সেই জনমতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নতুন স্থাপনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
মেয়র শাহাদাত হোসেন গত বছরের নভেম্বরে ঘোষণা দিয়েছিলেন, বিপ্লব উদ্যানে কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা হবে না, সবুজায়নই হবে অগ্রাধিকার। এমনকি তাঁর পূর্বসূরী রেজাউল করিম চৌধুরীর আমলে নির্মিত অবকাঠামো ভেঙে ফেলার কথাও জানিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান চুক্তি এবং নির্মাণ পরিকল্পনা তার পুরো বিপরীত চিত্রই তুলে ধরছে- একটি লোভনীয় বাণিজ্যিক প্রকল্প, যেখানে ২১টি দোকান, এটিএম বুথ, ডিজিটাল স্ক্রিন, শৌচাগার এবং কিয়স্কের মতো কাঠামোর সংস্থান রাখা হয়েছে।
সিটি করপোরেশন দাবি করছে, খোলা জায়গায় নতুন কোনো স্থাপনা হবে না। কিন্তু বিদ্যমান একতলা ভবনকে চারতলা করার যে সিদ্ধান্ত, তা নগরের উন্মুক্ত জায়গা ও পরিবেশের জন্যই মারাত্মক হুমকি। এটি প্রকৃতপক্ষে উদ্যান নয় বরং মুনাফাভিত্তিক একটি বাণিজ্যিক প্রকল্পে রূপান্তরের অপচেষ্টা।
এই অবস্থা নগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফুসফুসকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। নগরের পরিবেশ-পরিস্থিতি যেখানে প্রতিনিয়ত খারাপের দিকে যাচ্ছে, সেখানে একটি উন্মুক্ত, সবুজ, বিশুদ্ধ বাতাসের জায়গা সংরক্ষণ করাই হওয়া উচিত ছিল নগর কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার। বাস্তবে তাঁরা যা করছেন, তা নাগরিক অধিকার ও পরিবেশ-সচেতনতা- উভয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার শামিল।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের এই সিদ্ধান্তকে ‘উন্নয়ন’ বলা যায় না বরং এটি জনস্বার্থের প্রতি এক নির্মম ব্যঙ্গ। শুধু প্রকল্প নয়, এর পেছনে জনমত, গণতান্ত্রিক নৈতিকতা এবং নগরবাসীর স্বাস্থ্যবিধিকে অবজ্ঞা করা হয়েছে।
আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই- বিপ্লব উদ্যান কোনো বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, এটি নগরবাসীর জন্য উন্মুক্ত জনপরিসর। এখানে কোনো চারতলা ভবন নয়, আমরা চাই মাটি ও গাছগাছালির জগৎ। চাই মুক্ত বাতাসের ছোঁয়া, নির্মল ছায়া আর সবুজের প্রশান্তি। সিটি করপোরেশন যদি সত্যিই জনগণের হয়ে কাজ করতে চায়, তাহলে এখনই এই পরিবেশবিধ্বংসী পরিকল্পনা বন্ধ করে বিপ্লব উদ্যানকে তার আগের স্বরূপে ফিরিয়ে আনুক।

