২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগের দিন। রাজধানীর শিক্ষা প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র ‘শিক্ষাভবনে’ একটি ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা যায়—আন্দোলনবিরোধী স্লোগান নিয়ে রাস্তায় নামে সরকারি কর্মকর্তা পরিচয়ধারী একদল মানুষ। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের অন্তত ৪০ জন কর্মকর্তা অংশ নেন ওই মিছিলে। তারা স্লোগান দেন—‘চলছে লড়াই চলবে, শেখ হাসিনা লড়বে’, ‘শেখ হাসিনার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’, ‘শিক্ষামন্ত্রীর বাসায় হামলা কেন, খুনি খালেদা জবাব দে’—যা সাধারণত কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থকেরাই দিয়ে থাকেন।
ঘটনার ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন উইংয়ের পরিচালক অধ্যাপক কাজী মো. আবু কাইয়ুম শিশির অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রথম দফায় তিনি মাউশি ও বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত ২১ জন ক্যাডার কর্মকর্তাকে ডেকে জবানবন্দি নিয়েছেন। পর্যবেক্ষণ ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে দ্বিতীয় ধাপে আরও ২০–২২ জন কর্মকর্তাকে তলবের প্রস্তুতি চলছে।
এর আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর একই ধরনের মিছিলের ঘটনায় ১৬ জনকে শোকজ করেন কাইয়ুম শিশির। তবে সেই শোকজপত্রের ফাইল ‘গায়েব’ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিরুদ্ধে।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার দাবিতে দেশজুড়ে যখন ছাত্র আন্দোলন উত্তাল, তখন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল আন্দোলনকারীদের ‘এ যুগের রাজাকার’ বলে মন্তব্য করেন। এর পরদিন, ৩ আগস্ট, চট্টগ্রামে তার বাসভবনে হামলা হয়। তারই প্রতিবাদে ৪ আগস্ট মিছিল করেন শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শিক্ষাভবনের চত্বরে স্লোগান দিয়ে শুরু হয় মিছিল। পরে ভবনের প্রধান ফটকের সামনেই জড়ো হয়ে নানা রাজনৈতিক স্লোগান দেন কর্মকর্তারা। মিছিলে নেতৃত্ব দেন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও শিক্ষা ক্যাডারের ৩১তম ব্যাচের কর্মকর্তা মুকিব মিয়া, যিনি বর্তমানে আওয়ামী লীগের লিফলেট বিতরণের মামলায় কারাগারে আছেন। তার পাশাপাশি মিছিলে অংশ নেন মাউশির প্রশিক্ষণ শাখার সহকারী পরিচালক আবুল হোসেন কায়েস ও ইউসুফ রহমান, গবেষণা কর্মকর্তা সুমন বিশ্বাস, রিয়াদ আরাফাত, আইসিটি প্রকল্পের মেসবাহ উদ্দিন, সরকারি সংগীত কলেজের প্রভাষক মিজানুর রহমান, সেসিপ ও লেইস প্রকল্পের একাধিক কর্মকর্তা, ডিআইএর প্রায় ১৯ জন পরিদর্শকসহ অন্তত ৪০ জন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তাদের অনেকেই অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এমনকি তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু অংশগ্রহণকারী নিষিদ্ধ ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ঘটনার নেপথ্যে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাউশির তৎকালীন মহাপরিচালক (ডিজি) নেহাল আহমেদ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার পরিচালক এ কিউ এম শফিউল আজমসহ অন্তত ২০ জন কর্মকর্তা আগের দিন রাতে জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে এই মিছিলের পরিকল্পনা করেন।
স্টোররুমে জমা করা হয় লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র। মিছিলের খরচ বহন করতে প্রকল্পের পিডিদের (প্রকল্প পরিচালক) নির্দেশ দেন পরিচালক শফিউল আজম। তিনি বর্তমানে জামায়াত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত হলেও পূর্বে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ও নওফেলের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং একাধিক বিদেশ সফর করেছেন। তদন্তে উঠে এসেছে, মিছিলের পেছনে আরও ভূমিকা ছিল প্রশিক্ষণ পরিচালক শাহেদুল খবির চৌধুরী, প্রশাসন ও কলেজ শাখার পরিচালক সৈয়দ জাফর আলী, উপপরিচালক তানভীর হোসেন প্রমুখের।
সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী, অনিক (অফিসার ইনচার্জ) পদ্ধতির অধীনে কোনো সরকারি দপ্তরে শৃঙ্খলাজনিত অভিযোগ নিষ্পত্তির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তদন্তের ক্ষমতা রাখেন। সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই দায়িত্ব দেয়। অনিক’ হিসেবে অধ্যাপক কাইয়ুম শিশির অভিযুক্তদের সাক্ষ্য নিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার সুপারিশও করবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে থেকেও রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়া সরাসরি বিধিভঙ্গ। কেউ কেউ প্রাইজ পোস্টিং পেয়েছেন, কেউ বহাল তবিয়তে আছেন, অথচ শাস্তি হয়নি। আমি অনিক হিসেবে ক্ষমতা প্রয়োগ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই।’
এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা এ কিউ এম শফিউল আজম বলেন, ‘অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা। আমি মিছিল করতে নির্দেশ দিয়েছি—এমন প্রমাণ দিতে পারলে যে কোনো শাস্তি মাথা পেতে নেব।’ তবে কাইয়ুম শিশির দাবি করেছেন, ‘মিছিলে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারাই এসব শীর্ষ কর্মকর্তার নাম বলেছেন।’ অন্যদিকে, অভিযুক্ত সাবেক ডিজি নেহাল আহমেদের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
মিছিলে সরাসরি অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে আছেন—২৯তম বিসিএসের কায়েস, ইউসুফ রহমান, সুমন বিশ্বাস, রিয়াদ আরাফাত, তরিকুল ইসলাম, মেহেদী হাসান, জাহাঙ্গীর আলম, মিজানুর রহমান, আবদুল করিম সরদার, আমিনুর ইসলাম, ওয়াহিদুর রহমান, মাহবুবা ইয়াসমীন, মেসবাহ উদ্দিন, হাফিজুর রহমান শিকদার, এ বি এম আনোয়ার হোসেন।
এ ছাড়া ডিআইএর সোহান খানের স্ত্রী মনিরা মোর্শেদ, আবুল কালাম আজাদ, মনকিউল হাসানাত, দেলোয়ার হোসেন, মনিরুল ইসলাম মাসুম, শাহিনুর ইসলাম, খ ম মনজুরুল আলম, কে এম শফিকুল ইসলাম, আশরাফুল রহমান খান, মো. রিপন মিয়া, সরকার মো. শফিউল্লাহ দিদার, কামরুন নাহার, মোহাম্মদ ওয়ায়েছ আলকারনী মুন্সীসহ অনেকে ছিলেন এই কর্মসূচিতে। তাদের অনেকেই সঙ্গে কথা বলে স্লোগান দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, তারা ‘পরিস্থিতির শিকার’ হয়েছিলেন। তবে গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে শোকজ করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

