দেশে সাইবার ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আক্রান্তদের ৯৭ শতাংশই নারী ও শিশু। ‘সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন প্ল্যাটফর্ম’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও গৃহিণীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। ঢাকা শহর ডিজিটাল অপরাধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ব্ল্যাকমেল, পর্নোগ্রাফি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি ভুয়া নগ্ন ছবি ছড়িয়ে দেওয়া—এসবই সহিংসতার প্রধান ধরন।
এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার সমাজের নৈতিকতা ও মানসিক স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন ও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে একত্রে কাজ করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
দেশে সাইবার ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব সহিংসতার ৯৭ শতাংশ শিকার নারী ও শিশু। ‘সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন প্ল্যাটফর্ম’-এর সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে মোট ২৯টি নারী ও শিশু সাইবার সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যা বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এই প্ল্যাটফর্মটি মূলত অনলাইনে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকার দেয়ার জন্য গঠিত। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এর উদ্যোগে গঠিত এই প্ল্যাটফর্মে ব্র্যাক, নারীপক্ষ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, আসক, সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনসহ মোট ১৪টি সংগঠন কাজ করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে সাইবার সহিংসতার শিকারদের মধ্যে ৪১.৩ শতাংশ শিক্ষার্থী, ২০.৭ শতাংশ গৃহিণী, আর ১০.৫ শতাংশ বিক্রয়কর্মী, এনজিও কর্মী ও ব্যবসায়ী। সমাজের সবচেয়ে ভঙ্গুর ও সংবেদনশীল গোষ্ঠী এই সহিংসতার সবচেয়ে বড় শিকার। অপরদিকে, ২৭.৫ শতাংশের পেশা জানা যায়নি।
জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এপ্রিল ও মার্চ মাসে সবচেয়ে বেশি—মোট ১৯টি ঘটনা ঘটেছে, যা মোট ঘটনার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ। এলাকা হিসেবে ঢাকায় ১৩টি ঘটনা ঘটেছে, যা রাজধানীকে ডিজিটাল অপরাধের মূল কেন্দ্র বানিয়েছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৭৬ শতাংশ নারী, ২১ শতাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাশিশু ও ৩ শতাংশ পুরুষ।
সহিংসতার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্ল্যাকমেল, ধর্ষণ, পর্নোগ্রাফি কনটেন্ট ছড়ানো এবং এআই প্রযুক্তি দিয়ে ভুয়া নগ্ন ছবি তৈরি করে ব্ল্যাকমেলিং সবচেয়ে বেশি ঘটছে। কয়েকটি ঘটনার শিকার ৮-১২ বছর বয়সী শিশু। অধিকাংশ ঘটনাতেই একাধিক ধরনের সহিংসতা একসঙ্গে ঘটেছে, যেখানে ধর্ষণ, ভিডিও ধারণ, ব্ল্যাকমেল এবং ডিজিটাল কনটেন্ট ছড়ানো প্রায়শই মিলিত হয়েছে।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া নগ্ন ছবি তৈরি করা হয়েছে, যা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ছাড়াও সামাজিক নৈতিকতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বিপদ সংকেত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি একটি জরুরি অধিকার। এআই প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে অপরাধের মাত্রাও বাড়ছে। তাই সরকার, সামাজিক সংগঠন ও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে মিলিয়ে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
একই সঙ্গে সাইবার ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা করতে হবে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

