নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চন পৌরসভার নরাব, কাঞ্চন ও আমলাবো এলাকায় ২০০৮ সালের দিকে ‘পূর্বাচল ইস্টউড সিটি’ নামে একটি আবাসন প্রকল্প চালু করেন ফেনীর ছাগলনাইয়ার বাসিন্দা ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন। প্রথমে ছিল উন্নয়নের আশ্বাস। পরে তা রূপ নেয় আতঙ্কে। অভিযোগ উঠেছে, কৃষকদের জমি জোরপূর্বক দখল, ভয়ভীতি, হামলা, ভুয়া দলিল, এমনকি সরকারি খাল ভরাট পর্যন্ত।
প্রায় এক যুগ ধরে ভোগান্তির মধ্যে আছেন প্লট কিনে প্রতারিত হওয়া গ্রাহকরা। জমি দিয়েছেন, টাকা দিয়েছেন, কিন্তু আজও বুঝে পাননি প্রতিশ্রুত প্লট।
জমি না দিলেই ভয়—জোর করে বালু ফেলা, এরপর নামমাত্র দামে বিক্রি
স্থানীয়দের অভিযোগ, জমি দিতে রাজি না হলে কৃষকদের বাড়িঘরে হামলা চালানো হতো। কেউ প্রতিবাদ করলে হতো মিথ্যা মামলার শিকার। অনেকেই বাধ্য হয়ে নামমাত্র দামে জমি বিক্রি করেছেন ইস্টউড কর্তৃপক্ষকে।
সরকারি ছয়টি খাল ভরাট করা হয়েছে, যা পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এতে বর্ষায় এলাকাজুড়ে দেখা দেয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। ভোগান্তিতে পড়েন প্রায় ২০ হাজার মানুষ।
এক জমির জায়গায় তিনগুণ অনুমোদন—ভুয়া দলিল ও জাল কাগজে সম্পন্ন সব কিছু!
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পে ইস্টউড কোম্পানি জমি কিনেছে মোট ৭২.৬৭ একর। অথচ বিভিন্ন ভুয়া দলিল ও নামজারির মাধ্যমে তারা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েছে ১৪৮ একরের জমির জন্য।
- আমলাবো মৌজায়: কিনেছে ২৬ শতাংশ, অথচ অনুমোদন নিয়েছে ৮ একর
- নরাব মৌজায়: কিনেছে ২৭ একর, অনুমোদন নিয়েছে ৫০.১৮ একর
- কাঞ্চন মৌজায়: কিনেছে ৪৫.৪১ একর, অথচ অনুমোদন ৯০.২২ একর
অধিকাংশ জমিতে রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি, মসজিদ ও দোকান। এসব জায়গা জোর করে অধিগ্রহণের পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ জমা, আন্দোলন, তদন্ত কমিটি
গত বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পালাবদলের পর সাহস পেতে থাকেন স্থানীয়রা। ২৬ মে মানববন্ধন ও বিক্ষোভে তারা সরব হন ইস্টউড সিটির বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তর, কাঞ্চন পৌরসভার মেয়র ও জেলা প্রশাসকের দপ্তরে।
২২ ডিসেম্বর জমা দেওয়া এক আবেদনের পর ২৩ এপ্রিল পরিবেশ অধিদপ্তরে শুনানি হয়। তবে উপস্থিত ছিলেন না কোম্পানির চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন।
অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন মনির হোসেন মাস্টার। তার দাবি, প্রকল্পের অনুমোদনের জন্য ৭০ শতাংশ জমি ক্রয় বাধ্যতামূলক, কিন্তু ইস্টউড প্রকল্প ৪৫ শতাংশ জমি কিনেই ভুয়া দলিল দেখিয়ে ছাড়পত্র নেয়।
নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এএইচএম রাশেদ বলেন, “পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নির্দেশে একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে আছি আমি, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মাসুদ ইকবাল শামীম ও পূর্বাচল সার্কেলের সহকারী কমিশনার তাছবীর হোসেন (ভূমি)। কাজ শুরু হয়েছে, ফল আসতে কিছু সময় লাগবে।”
প্লট কিনেছেন যারা, তারা আজ সর্বস্বান্ত। একজন বলেন, “৮-১০ বছর আগে কিনেছি। বিজ্ঞাপন ছিল আকর্ষণীয়। কিন্তু আজও আমরা প্লট পাইনি। কাজ শেষ হয়নি। শুধু প্রতিশ্রুতি, বাস্তব কিছু নেই।”
প্রজেক্ট ইনচার্জ জসিম উদ্দিন বলেন, “খাল ভরাটের অভিযোগ মিথ্যা। বরং আমরা খাল পরিষ্কার করে দিয়েছি। পানি আটকে যাওয়ার কারণ আমাদের জানা নেই।”
চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন দাবি করেন, “সব অনুমোদন নিয়ম মেনেই নেওয়া হয়েছে। আমরা কোনো খাল বা জমি জোর করে দখল করিনি। কাজ শেষ হলে সবাইকে প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হবে। কেউ অভিযোগ করলে আমরা দেখব।”

