দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে আরেকটি ভয়াবহ কেলেঙ্কারির পর্দা উঠেছে। এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ২০২৩ সালের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন—আক্ষরিক অর্থেই একটি সাজানো-গোছানো প্রতারণা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গোপন অডিটে দেখা গেছে, প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকটি যেখানে ২,২৫৯ কোটি টাকার লোকসানে, সেখানে কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে ১২৮ কোটি টাকার লাভ!
কেন এই ভেলকিবাজি? উদ্দেশ্য ছিল একটাই—এই ভুয়া লাভের অজুহাতে ৫% নগদ ও ৫% স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণার মাধ্যমে এস আলম পরিবার ও তাদের ঘনিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডারদের পকেটে সেই অর্থ পৌঁছে দেওয়া।
তবে ভাগ্যের পরিহাস—যে দিন বার্ষিক সাধারণ সভায় এই মুনাফা অনুমোদনের কথা ছিল (৮ আগস্ট ২০২৪), তার ঠিক তিন দিন আগেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সেই ঐতিহাসিক গণজোয়ার অনিচ্ছা সত্ত্বেও রুখে দেয় এই অর্থ লোপাটের প্রক্রিয়া।
ব্যাংকের সাবেক পরিচালনা পর্ষদ এক অভিনব ‘উইন্ডো ড্রেসিং’-এর আশ্রয় নেয়—যেখানে খেলাপি ঋণ গোপন করে কৃত্রিমভাবে মুনাফা বাড়িয়ে দেখানো হয়।
অভ্যন্তরীণভাবে যেসব ঋণ দীর্ঘদিনে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, সেগুলোকে “নিয়মিত” হিসেবে দেখিয়ে ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণের হার মাত্র ২.৬১% দেখানো হয়। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২,০২৮ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট ঋণের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
এই ভয়ঙ্কর আর্থিক কারসাজির তথ্য ফাঁস করেন গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান ও স্বতন্ত্র পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল আমিন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “২০২৩ সালের প্রতিবেদন ছিল প্রতারণামূলক। পরিসংখ্যান জাল করে মূলত লোকসানকে ঢেকে রাখা হয়েছিল।”
তাঁর মতে, খেলাপি ঋণ গোপন রেখে কৃত্রিমভাবে মুনাফা দেখানো হয়, যাতে শেয়ারহোল্ডারদের বিভ্রান্ত করা যায় এবং কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে লভ্যাংশ ঘোষণা সম্ভব হয়।
ব্যাংকের এ প্রতিবেদন যাচাই করে যে অডিট প্রতিষ্ঠান—শফিক বসাক অ্যান্ড কো.—তাদের ভূমিকাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (FRC), বিএসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংক—তিনটি সংস্থাই এখন এই ঘটনায় তদন্ত চালাচ্ছে।
FRC চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, কার মাধ্যমে প্রতারণাটি সংঘটিত হয়েছে—ব্যাংক ব্যবস্থাপনা নাকি অডিটর, সেটি বের করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রথমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি আয় (EPS) দেখানো হয় ১.৩০ টাকা। কিন্তু পুনঃনিরীক্ষা শেষে দেখা যায়, EPS আসলে ঋণাত্মক ২১.৭৯ টাকা! নিট সম্পদ মূল্য দাঁড়িয়েছে মাইনাস ৯.১৪ টাকা।
ডিএসইতে প্রকাশিত সংশোধিত প্রতিবেদন থেকেই এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে।
২০২২ সালে এই ব্যাংক IPO’র মাধ্যমে বাজার থেকে তুলেছিল ৪২৫ কোটি টাকা। সেই সময় শেয়ার ইস্যু মূল্য ছিল ১০ টাকা। বর্তমানে সেটি নেমে এসেছে মাত্র ৩.৩০ টাকায়—যা বিনিয়োগকারীদের জন্য মারাত্মক ধস।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়। নতুন বোর্ড দায়িত্ব নিয়েই ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ্যে আনে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তারল্য সহায়তা চায়। এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ২,৫০০ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
নতুন চেয়ারম্যান নুরুল আমিনের বক্তব্য, “আমরা এখন চেষ্টা করছি ব্যাংকটিকে ধ্বংসের মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু এই পুনরুদ্ধার হবে অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।”
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের এই প্রতারণা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নয়—এটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থার ওপর সরাসরি আঘাত। শেয়ারহোল্ডার, বিনিয়োগকারী, আমানতকারী—সবার ক্ষতির বোঝা এখন কাঁধে।
এখন প্রশ্ন হলো—এই জালিয়াতির নাটকের প্রকৃত কুশীলবদের কি শাস্তি হবে? নাকি রাজনৈতিক পালাবদলের আড়ালে সব ভুলে যাবে?

