সৌদি আরবে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতে প্রস্তুত হচ্ছিলেন মতিন। গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার পল্টনে অবস্থিত একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তিনি গালফগামী কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক মেডিকেল সার্টিফিকেশনের প্রক্রিয়া শুরু করেন।
এজেন্সিটি তাকে দুই ধরনের প্যাকেজের প্রস্তাব দেয়—একটি ১০ হাজার টাকার ‘স্ট্যান্ডার্ড’ প্যাকেজ, যাতে কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা ধরা পড়লে ‘অযোগ্য (unfit)’ সার্টিফিকেট দেওয়া হবে, যার ফলে পাসপোর্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে যেতে পারে। অন্যটি ২০ হাজার টাকার, যা ‘যেকোনো অবস্থায় ফিট’ সার্টিফিকেট নিশ্চিত করে।
“আমি সুস্থ মনে করেই ১০ হাজার টাকার প্যাকেজ নেই,” বললেন মতিন। পরে তিনি রাজধানীর ১০০-ফুট সড়কের কাছাকাছি একটি সেন্টারে টেস্ট দিয়ে ‘ফিট’ সার্টিফিকেট পান। তবে প্রশাসনিক জটিলতায় এখনও তার যাত্রা আটকে আছে।
কক্সবাজারের রাব্বি ২৫ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে একটি ‘ফিট’ সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেন। সৌদি পৌঁছানোর পর দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় তিনি ‘অযোগ্য’ প্রমাণিত হন এবং সঙ্গে সঙ্গেই দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এখন ঋণের বোঝা নিয়ে দিশেহারা তিনি।
‘গামকা’র ছায়া থেকে সিন্ডিকেটের আধিপত্য
আগের নাম গামকা (GAMCA)। এখন গালফ হেলথ কাউন্সিল পরিচালিত ওয়াফিদ সিস্টেমের আওতায় বাংলাদেশের প্রায় ২০০টি জিসিসি অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার রয়েছে। কিন্তু শিল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, এর মধ্যে মাত্র ২০টি সেন্টার প্রতিদিন শত শত টেস্ট করে; বাকিরা প্রায় কাজ পাচ্ছে না। সিন্ডিকেট এজেন্টরা আগেভাগে শত শত রেফারেল স্লট বুক করে রাখায় এই বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
একজন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক জানান, পরীক্ষাগুলো ঢাকা থেকেই করা হয় কিন্তু রিপোর্ট দেওয়া হয় জেলা-ভিত্তিক সেন্টারের নামে, যাতে প্রশাসনিক নজরদারি এড়ানো যায়।
এই সিন্ডিকেট ‘ফিট’ সার্টিফিকেটের জন্য ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করে, যা সরকারি নির্ধারিত সর্বোচ্চ ফি ৯ হাজার টাকার তিন গুণ।
মাফিয়া নেটওয়ার্ক ও কোটি টাকার রোজগার
এক উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানায়, এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন মো. বশির (যিনি ১২টির বেশি সেন্টারের মালিক ও রাব্বি ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যুক্ত), নোমান চৌধুরী ও ইনাম চৌধুরী। যোগাযোগ করা হলে বশির বলেন, “আমি কখনো শুনিনি যে কেউ সার্টিফিকেটের অপব্যবহার করেছে।” নোমান ও ইনাম একাধিকবার ফোন করেও সাড়া দেননি।
প্রাক্তন গামকা সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস বলেন, “কর্মীদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় করা হচ্ছে। আমরা বিষয়টি সমাধানে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করছি।”
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত এক দশক ধরে জিসিসি অ্যাপ্রুভড মেডিকেল সেন্টার অ্যাসোসিয়েশনের কোনো কার্যকরী কমিটি নেই। বর্তমানে নোমান চৌধুরী অঘোষিতভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
ক্ষোভে ফুঁসছে উপেক্ষিত সেন্টারগুলো
গত ২৬ জুন ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনুমোদিত কেন্দ্রগুলোর অনেকেই।
“মোট কেন্দ্রের ৯৫ শতাংশ কোনো কাজ পাচ্ছে না। মাত্র কয়েকটি সেন্টার পুরো সিস্টেম দখলে নিয়ে কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছে,” বলেন এক সদস্য।
আরেকজন বলেন, “এটা শুধু দুর্নীতি নয়, বরং মানুষের জীবন নিয়ে খেলা। ভুয়া সার্টিফিকেটধারী কর্মীরা বিদেশে গিয়ে ফেরত আসছেন। এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
সরকারি তদন্তে অগ্রগতি?
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্ট উইং) এজেডএম নুরুল হক বলেন, “সার্টিফিকেট দিতে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ শুনেছি, তবে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাইনি।”
তিনি জানান, “গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। নিজেরাও তদন্ত করছি।”

