গত দেড় দশকে দেশের আর্থিক খাতকে দুর্বল করে ফেলার পেছনে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নানা অনিয়মে জড়িতদের তালিকা তৈরি করছে সংস্থাটি। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক তিন গভর্নর, চার ডেপুটি গভর্নরসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নরের কাছে এক চিঠিতে অন্তত ২৩ ধরনের তথ্য চেয়েছে দুদক। দুদকের উপপরিচালক মোমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে গত ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে যেসব অনিয়ম হয়েছে, সেগুলোর বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
তথ্য চাওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান, ফজলে কবির ও আব্দুর রউফ তালুকদার, সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী, এস এম মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান ও আবু ফরাহ মোহাম্মদ নাছের এবং বিএফআইইউর সাবেক প্রধান মাসুদ বিশ্বাস ও কাজী সায়েদুর রহমানের বিষয়ে। তাঁরা সবাই গত ১৫ বছরে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করেছেন।
চিঠিতে এসব কর্মকর্তার দায়িত্বকালীন সময়ের নতুন ব্যাংকের অনুমোদন, ঋণ নীতিমালা, ঋণ বিতরণ, অর্থ পাচার, রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ–সংক্রান্ত তথ্য ও নথিপত্র চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া যদি বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্বভাবে কোনো তদন্ত করে থাকে, সে সম্পর্কিত প্রতিবেদনও চেয়েছে দুদক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে: ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, ঋণখেলাপিদের ছাড় দিয়ে নীতিমালা জারি, রিজার্ভ চুরি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, এস আলম গ্রুপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণ জালিয়াতিতে সহায়তা ইত্যাদি। এসব ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন জানিয়েছেন, আর্থিক অনিয়ম তদন্তে কমিশনের একাধিক টিম কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১১টি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ একাধিক সংস্থা এতে যুক্ত আছে। বিশেষ করে অর্থ পাচার ও ব্যাংক জালিয়াতি নিয়ে আলাদাভাবে কাজ হচ্ছে। অনুসন্ধান শেষ হলে আমরা গণমাধ্যমে তথ্য তুলে ধরব।’
২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর সরকার যেসব নতুন ব্যাংককে লাইসেন্স দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: মেঘনা ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও দ্য ফারমার্স ব্যাংক। এসব ব্যাংকের অনুমোদন-সংক্রান্ত সব নথি, পরিপত্র ও নির্দেশনার কপি চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বেক্সিমকো, এম আর গ্রুপ, রতনপুর, কেয়া, যমুনা, থার্মেক্স, সিকদার, বিপিএস, আব্দুল মোনেম লিমিটেড, অ্যানন টেক্সসহ যেসব শিল্প গ্রুপ ঋণখেলাপি হয়ে সুবিধা পেয়েছে, তাদেরও নাম, মালিকের পরিচয়, ঠিকানা, ঋণের পরিমাণ ও বর্তমান অবস্থা জানতে চাওয়া হয়েছে।
সালমান এফ রহমানের চিঠির প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালাসহ ব্যাংক পরিদর্শনসংক্রান্ত সব নীতিমালার নথি, ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেনা ও মালিকানা পরিবর্তনসংক্রান্ত নথিও চেয়েছে দুদক। এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যদি কোনো তদন্ত হয়ে থাকে, তার প্রতিবেদনও চাওয়া হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণ নিয়েছে, তারা কোন শাখা থেকে কত টাকা ঋণ নিয়েছে, বর্তমান অবস্থা কী—এসব তথ্যও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চাওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠলে এমন অপরাধ সংঘটিত হয়। যারা আর্থিক খাত পরিচালনা করেন, তাদের জবাবদিহির অভাব থাকলে দুর্নীতি বাড়বেই। সুশাসন ও কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। দুদকেরও এখন কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।’

