মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হয় কীভাবে?’—মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে প্রকাশ্যে একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার ভিডিও দেখে এ প্রশ্ন এখন সবার মুখে। ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে গত বুধবার দিনের আলোয় ইট-পাথরের আঘাতে হত্যা করা হয়। চারপাশে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ এগিয়ে আসেননি।
এর আগে ১ জুন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে বিএনপির দুই নেতার সংঘর্ষে মহব্বত হোসেন ও ইউনুছ আলী খুন হন। মুরাদনগরে ধর্ষণের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায়ও সম্প্রতি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
সারা দেশে অপরাধ বাড়ছে—এ কথা স্বীকার করছে পুলিশ সদর দপ্তরও। তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে মোট ১,৯৩০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। মাসওয়ারি হিসাব বলছে, জানুয়ারিতে খুন হয় ২৯৪ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০ জন, মার্চে ৩১৬ জন, এপ্রিলে ৩৩৬ জন, মে মাসে ৩৪১ জন এবং জুনে সর্বোচ্চ ৩৪৩ জন। প্রতিটি মাসে খুনের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন, ঢাকা রেঞ্জ ও চট্টগ্রাম রেঞ্জে খুনের সংখ্যা বেশি। অধিকাংশ ঘটনার পেছনে চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কাজ করেছে। পুরান ঢাকায় সোহাগ হত্যাকাণ্ডও এর সাম্প্রতিক উদাহরণ।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) এসএন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মিটফোর্ডের ঘটনাটি চরম নৃশংসতা। অপরাধী কোনো দলের নয়—সে একজন অপরাধী। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ খুনের পাশাপাশি দেশে ডাকাতি, ছিনতাই, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং অপহরণের ঘটনাও বাড়ছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ডাকাতি হয়েছে ৩৬৬টি, যার মধ্যে ফেব্রুয়ারিতেই ঘটেছে সর্বোচ্চ ৭৪টি। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ১১ হাজার ৮টি। এপ্রিলে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে।
এই পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন মানবাধিকার কর্মীরাও। পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য এএসএম নাসির উদ্দিন এলান বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের অর্জনে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ঢুকে পড়েছে। সরকারকে দলমত নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’
গত শুক্রবার খুলনার দৌলতপুরে যুবদলের সাবেক নেতা মাহবুবুর রহমানকে গুলি করে ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পুলিশ বলছে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ নিয়ে জানতে চাইলে খুলনা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এ হত্যাকাণ্ড হয়েছে।’
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে পদক্ষেপ নিচ্ছে পুলিশ সদর দপ্তর। গতকাল পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম জানিয়েছেন, সারা দেশে আধিপত্য বিস্তারকারীদের তালিকা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়নে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতাও দরকার।’ সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ মনে করেন, আইন-শৃঙ্খলার এ চিত্রের পেছনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবও রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিগত সময়ে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পার হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে রাজনৈতিক সরকার গঠনের বিকল্প নেই।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) ইনামুল হক সাগর বলেন, ‘পুলিশ অপরাধ প্রতিরোধে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। কোনো অপরাধ হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছে। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। সমাজ ও পরিবারের সবাইকে সচেতন হতে হবে। সহনশীলতা ও ধৈর্য ছাড়া উত্তরণ সম্ভব নয়।’
এদিকে গতকাল পুরান ঢাকার মিল ব্যারাকে পুলিশ লাইন, রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স ও ট্রাফিক ড্রাইভিং স্কুল পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘মিটফোর্ডের ব্যবসায়ী হত্যাকাণ্ড খুবই দুঃখজনক। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনোভাবেই নির্লিপ্ত নয়। সামান্য দেরি হলেও প্রতিটি ঘটনায় তাৎক্ষণিক অ্যাকশনে যাওয়া হচ্ছে।’

