সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ১০ বছরের বেশি সময় দায়িত্বে ছিলেন। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে তার ছেলে শাফি মুদ্দাসির খান জ্যোতি হয়ে ওঠেন দেশের ‘ছায়া মন্ত্রী’। জ্যোতি নিজেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় প্রজন্মের ‘দানব বাহিনী’ গড়ে তুলেছিল, যারা মূলত আওয়ামী নেতাদের ছেলে ছেলেদের মধ্যে থেকে তৈরি হয়েছিল। তবে তারা রাজনীতিবিদ হিসেবে নয়, বরং সন্ত্রাসী ও মাফিয়া হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।

এই দ্বিতীয় প্রজন্মের দানবরা ছিলেন অত্যন্ত হিংস্র, আক্রমণাত্মক ও জনগণের ওপর নিপীড়নকারী। তাদের মধ্যে ছিলেন আসাদুজ্জামান খান কামালের ছেলে জ্যোতি, গাজী গোলাম দস্তগীরের ছেলে গাজী গোলাম মর্তুজা পাপ্পু, শামীম ওসমান, নিজাম হাজারী, হাজী সেলিমের ছেলে ও অনেকে। জ্যোতি ছিল তাদের সরদার।
জ্যোতির নেতৃত্বে এই সন্ত্রাসী বাহিনী ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠীকে হয়রানি করত। জমি দখল, চাঁদাবাজি ও মিথ্যা মামলা দিয়ে তারা নানা প্রতিষ্ঠানকে ভয়ভীতি দেখাত। বসুন্ধরা মিডিয়া প্রথম এই অপকর্মের বিস্তারিত প্রকাশ করে। দেশের নানা এলাকায় তাদের অত্যাচারের খবর উঠে আসে। এর পর থেকে বসুন্ধরা গ্রুপ ‘জ্যোতি গং’দের টার্গেট হয়ে পড়ে। ২০১৫ সাল থেকে বসুন্ধরা মিডিয়া ও বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়। কখনো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে, কখনো বানোয়াট হত্যা মামলায় হয়রানি চালানো হয়। আসলে চাঁদা আদায় করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
জ্যোতি ও তার সহযোগীরা মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসসহ নানা অপরাধে জড়িত ছিল। পাশাপাশি বসুন্ধরা গ্রুপের উদ্যোক্তাদের গুম ও ‘আয়নাঘরে’ নেওয়ার ভয় দেখানো হতো। চাঁদাবাজি ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও এর অধীন সংস্থায় নিয়োগ, বদলি ও টেন্ডারবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন শাফি মুদ্দাসির খান জ্যোতি। মন্ত্রীর বাসায় বস্তাবন্দি টাকা যাওয়ার পিছনে জ্যোতির হাত ছিল। বাবার ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা শত শত কোটি টাকা লুটপাট করেছিল। বাবার নেতৃত্বে বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল, যার মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ সঞ্চয় হয়।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গেও সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। কিছুদিন আগে জ্যোতিকে গ্রেপ্তার করা হয়। রিমান্ডে থেকে তিনি পুলিশকে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন। মন্ত্রণালয় ছাড়াও রাজধানীর ধানমন্ডিতে জ্যোতির একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। সেখানে রেস্টুরেন্ট চালাতে হলে তাকে বড় অঙ্কের চাঁদা দিতে হতো। লাইসেন্স পাওয়া সহজ হতো অধিক চাঁদা দিলে। কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন ব্যবসা, ফুটপাত, মাদক ব্যবসা ও আবাসিক হোটেল থেকেও প্রতিদিন চাঁদা আদায় হতো। এসব টাকা মন্ত্রীর এপিএস মনির হোসেনসহ দুজনের মাধ্যমে মন্ত্রী ও তার ছেলের কাছে পৌঁছাত।

দুদক প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পেয়েছে আসাদুজ্জামান খান কামাল ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ আছে। দুদকের মামলা অনুসারে, কামাল, তার স্ত্রী লুৎফুল তাহমিনা খান, ছেলে জ্যোতি, মেয়ে সোফিয়া তাসনিম খান ও একান্ত সচিব মনির হোসেনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সাবেক মন্ত্রী ঘুষ স্বরূপ বস্তাবন্দি টাকা নিতেন। পুলিশ, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিস থেকে টাকা আদায় করা হতো। এই সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব ড. হারুন অর রশীদ বিশ্বাস। সিন্ডিকেটের অন্য সদস্য ছিলেন যুগ্ম সচিব ধনঞ্জয় কুমার দাস, মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব মনির হোসেন, জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফ মাহমুদ অপু, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোল্লা ইব্রাহিম হোসেন ও মন্ত্রীর ছেলে জ্যোতি। টাকা আদায় ও উত্তোলনে ড. হারুন অর রশীদ প্রধান ভূমিকা পালন করতেন।
হারুন অর রশীদ অবসর নেওয়ার পরেও মন্ত্রণালয়ের ঘুষ-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন জ্যোতি। ঝুঁকি এড়াতে ঘুষের টাকা বিদেশে পাঠানো হতো। জেলা পুলিশ সুপার নিয়োগে ৮০ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা নেয়া হত। পুলিশের বিভিন্ন পদে নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতেও ১ থেকে ৩ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছিল। ২০২২ সালে এক মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার নিয়োগে ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সিন্ডিকেট।
এনজিওগুলোর ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ (এনওসি) পেতে ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা দিতে হতো সিন্ডিকেটকে। নিয়োগ শুরুতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালকের কাছে মন্ত্রীর দপ্তর থেকে ২৫০ জনের একটি তালিকা পাঠানো হয়। সাবেক মন্ত্রীর নির্দেশে সেই তালিকা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে বাধ্য হয় ফায়ার সার্ভিস। জনপ্রতি ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা আদায় করত সিন্ডিকেট।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, এসআই ও সার্জেন্ট পদে নিয়োগের মাধ্যমে শতকোটি টাকা হাতিয়েছে সিন্ডিকেট। পাঁচ সদস্যের এই সিন্ডিকেট নিয়ে পুলিশের কাছে গোপন প্রতিবেদনও জমা পড়ে। নিয়োগ দুর্নীতিতে সাবেক মন্ত্রীর পক্ষে একেকজন প্রার্থী থেকে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে পছন্দের তালিকা তৈরি করা হতো। জ্যোতি ছিলেন এ অর্থ আদায়ের প্রধান দায়িত্বে। তিনি দেশে দুর্নীতিবাজদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
বর্তমানে জ্যোতি গ্রেপ্তার হলেও তার বেশির ভাগ সহযোগী পলাতক। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পেয়েছে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ২০০ কোটি টাকার বেশি মানি লন্ডারিংয়ের তথ্য। মোট মিলিয়ে প্রমাণ হয়েছে ৩০০ কোটি টাকারও বেশি দুর্নীতি।
দুদকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তদন্তে সাবেক মন্ত্রীর নামে ১০০ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ও ব্যাংকে শতকোটি টাকার অধিক নগদ অর্থ পাওয়া গেছে। এপিএস মনিরের বিরুদ্ধে প্রায় ২০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া ২০০ কোটি টাকার মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধেও প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। মন্ত্রীর আরও পাঁচ সহযোগীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ সংগ্রহ করেছে দুদক।

