বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি রিং শাইন টেক্সটাইলস লিমিটেড–এর নামে নতুন শেয়ার ইস্যু করে কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এ কেলেঙ্কারিতে জড়িত রয়েছেন বিতর্কিত সাবেক কর কর্মকর্তা মতিউর রহমান এবং ফার গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল কাদের ফারুক। এসব তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তদন্তে। এই চক্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন ভারতীয় নাগরিক অশোক কুমার চিরিমার, যিনি রিং শাইনের সাপ্লাই চেইন এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন।
গতকাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিএসইসি জানিয়েছে, রিং শাইন টেক্সটাইলস–সংশ্লিষ্ট ১৩ জনের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন কোম্পানির স্পনসর, সাবেক পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাহী পরিচালক, চিফ ফিনান্সিয়াল অফিসার (সিএফও), কোম্পানি সচিব এবং মূল অভিযুক্ত ফারুক ও চিরিমার। প্রতারক চক্রটি ১০ টাকা ফেসভ্যালুতে ১১২ কোটি টাকার শেয়ার বরাদ্দ দেয়, অথচ কোম্পানির হিসাবে এক টাকাও জমা হয়নি। বরং তারা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর ১৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে বিনামূল্যে পাওয়া শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে প্রস্থান করে।
সাধারণত প্লেসমেন্ট শেয়ারগুলোর নির্দিষ্ট লক-ইন সময় থাকে। কিন্তু শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন বিএসইসি কমিশন কেস-বাই-কেস ভিত্তিতে তা বিক্রির অনুমতি দেয়। এতে ৭৬ জন প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডারের মধ্যে ৬৪ জন শেয়ার বিক্রি করেন। বর্তমানে ওই কোম্পানির শেয়ারের দাম নেমে এসেছে ৩ টাকা ২০ পয়সায়।
রিং শাইন টেক্সটাইল যাত্রা শুরু করে ১৯৯৭ সালে, মাত্র ৪,০০০ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে। ২০০২ সালে মূলধন বাড়িয়ে করা হয় ৯.৯৫ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে ২৭ কোটি ৫১ লাখ নতুন শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে তা বাড়িয়ে করা হয় ২৮৫.০৫ কোটি টাকা। এসব শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া হয় ১১ জন বিদেশি স্পনসর এবং ৭৩ জন দেশীয় বহিরাগত বিনিয়োগকারীদের, যাদের সম্মিলিত মালিকানা যথাক্রমে ৫৯.৪৪ ও ৪০.৫৬ শতাংশ। ২০১৯ সালে তৎকালীন বিএসইসি চেয়ারম্যান এম খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বে কোম্পানিটি ১৫০ কোটি টাকা আইপিও’র মাধ্যমে উত্তোলনের অনুমোদন পায়।
বিএসইসির নথি অনুযায়ী, ৭৬ জনের নামে বরাদ্দকৃত ২৭ কোটি ৫১ লাখ শেয়ারের কোনো অর্থ কোম্পানির হিসাবে জমা পড়েনি। এমনকি স্পনসররাও টাকা দেননি। এই ৭৬ জনের মধ্যে রয়েছেন আবদুল কাদের ফারুক ও তার পরিবারের সদস্যরা, কর কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও তার আত্মীয়-স্বজন এবং কিছু সরকারি কর্মকর্তা।
ফারুক ও তার পরিবার পেয়েছেন ৮.৩২ লাখ শেয়ার। শুধু তার পরিবারের ২৪ জন সদস্য পেয়েছেন মোট ২৯.২ শতাংশ শেয়ার। স্ত্রী নাসরিন আক্তার বানু ও হোসনে আরা বেগম যথাক্রমে পেয়েছেন ৫৬.৭৩ ও ৬১.৯২ লাখ শেয়ার। মেয়ে রেজওয়ানা রহমান রিনি পেয়েছেন ২০.৫৫ লাখ শেয়ার। সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছেন জাকিয়া খন্দকার (১.১৯ কোটি) ও মনিরা খন্দকার (১.১৩ কোটি)।
মতিউরের পরিবারের বরাদ্দ ছিল মোট ১৫.৭৫ লাখ শেয়ার, যার মূল্য ১.৫৭ কোটি টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। তার প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল শুজ পেয়েছে ৫ লাখ শেয়ার, মতিউর নিজে পেয়েছেন ২.৫ লাখ শেয়ার এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন পেয়েছেন ৮.২৫ লাখ শেয়ার।
বিএসইসির এক চিঠিতে বলা হয়েছে, অশোক চিরিমার ফারুক ও তার এক বন্ধুকে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন, যাদের মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের পরিকল্পনা করা হয়। এরপর ফারুককে ৪০ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়। এ সংক্রান্ত সমঝোতা অনুযায়ী, তিনি যেকোনো সময় শেয়ার হস্তান্তর বা বিক্রি করতে পারেন। রিং শাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাঙ্গ ওয়ে মিনের সহায়তায় ফারুক শেয়ার বিক্রির জন্য কৃত্রিম হিসাব ও নথিপত্র তৈরি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইপিও প্রসপেক্টাসে মিথ্যা তথ্য দেওয়ায় রিং শাইনের সাবেক পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিএফওসহ ১৩ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বিএসইসি। একইসঙ্গে দুর্নীতির ঘটনায় কাদের ফারুক ও চিরিমারসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুদকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। রিং শাইনের শেয়ার প্লেসমেন্টে ইস্যু ম্যানেজারের পরিবর্তে ফারুককে যুক্ত করার ঘটনায় কোম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ইস্যু ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বে থাকা এএফসি ক্যাপিটাল লিমিটেড ও সিএপিএম অ্যাডভাইজরি লিমিটেড–এর সিইওদের পাঁচ বছরের জন্য পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাদের নিবন্ধন সনদ বাতিলের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০ পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর ভুয়া আর্থিক বিবরণী দেওয়ায় চারটি অডিট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলে (এফআরসি) অভিযোগ পাঠানো হয়েছে। এগুলো হলো: আহমেদ অ্যান্ড আখতার, শিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কো, মাহফেল হক অ্যান্ড কো, ও এটিএ খান অ্যান্ড কো। এসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট পার্টনারদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিএসইসির তদন্ত বলছে, প্লেসমেন্ট শেয়ারধারীরা তাদের নামে শেয়ার বরাদ্দ নিলেও এক টাকাও পরিশোধ করেননি, যা সরাসরি অর্থ আত্মসাতের শামিল। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, রিং শাইনের শেয়ার ইস্যু, অর্থ উত্তোলন ও বিক্রির পুরো পরিকল্পনার পেছনে মূল ভূমিকা ছিল কাদের ফারুক ও অশোক চিরিমারের।

