চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্রে সরকারি কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি দখলে নিতে ভূমি অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ভূমিদস্যুদের সঙ্গে মিলে রক্ষকের বদলে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তদন্তে উঠে এসেছে—প্রথমে একসনা লিজ, পরে শ্রেণি পরিবর্তন, জাল খতিয়ান, বানোয়াট দলিল, ভুয়া আমমোক্তারনামা, মিথ্যা ওয়ারিশ সনদ ও জাল এনআইডির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি আত্মসাতের এক বিস্তৃত চক্র। প্রশাসন তদন্ত করলেও ভূমি অফিস সংশ্লিষ্টরা ও দখলদার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে এই ফাঁক গলে দখল চলছে নিরবচ্ছিন্নভাবে।
মামলার নথি ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরের এম এম আলী রোডে অবস্থিত অবাঙালি সৈয়দ আহমদ হাশেমীর ৮৭ শতক জমি এক সময় সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসে। হাশেমী স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তান চলে যান ও সেখানেই মারা যান। কিছুদিন তার চাচাতো ভাই আমীন আলী সম্পত্তি ব্যবহার করলেও ১৯৮৭ সালে এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং পরের বছর তা ৯ জনকে একসনা ইজারা দেয় জেলা প্রশাসন।
তবে এর পর থেকেই ভূমি অফিসের ভেতরে ও বাইরে সক্রিয় হয়ে ওঠে একটি দখলদার চক্র। জেলা প্রশাসনের এক কর্মচারী মোহাম্মদ ইউনুসের সহায়তায় অজ্ঞাত রইসা আজিজ নামের এক নারীকে সম্পত্তির মালিক সাজানো হয়। পরবর্তীতে আমমোক্তার অমর কুমার শর্মাকে ব্যবহার করে ২০০৮ সালের ১৫ অক্টোবর জালিয়াতির মাধ্যমে ১৫৫১৪ নম্বর দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়। এরপর বৈধ ইজারাগ্রহীতা মনোয়ার হোসেনদের বিরুদ্ধেই মিস মামলা দায়ের করেন দখলকারীরা।

একই বছরের ২৩ অক্টোবর ১৫৯৯৬ নম্বর বায়নানামা দলিলও তৈরি করা হয়। পরে জনৈক নুরুল আলম ২০১৪ সালে ভূমি সচিবের কাছে আবেদন করে নিজেকে আমমোক্তার দাবি করেন। একই উদ্দেশ্যে আলী নূর চৌধুরী নামে আরেকজন উচ্চ আদালতে রিট করেন। সিন্ডিকেটের আরও সদস্য নাজিম উদ্দিন ২০১৫ সালের ১৯ মার্চ ৪০৩৮ নম্বর বায়নানামা দলিল তৈরি করেন। এভাবে ভুয়া পরিচয়ে ও সাজানো দলিলপত্রে প্রায় দুই শত কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি দখলের চেষ্টা চলে দীর্ঘদিন ধরে।
২০২৩ সালের ২ নভেম্বর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবদুল মালেক এক প্রতিবেদনে জানান, বিএস জরিপে এই জমি রইসা আজিজের নামে দেখানো হয়েছে, যা সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে। সেই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ভূমিদস্যু চক্র জাল দলিল, ভুয়া ওয়ারিশ সনদ, এনআইডি, বায়নানামা ও আমমোক্তারনামা তৈরির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি দখলের অপচেষ্টায় লিপ্ত। উল্লেখযোগ্য যে, হাশেমীর কোনো উত্তরসূরি বাংলাদেশে নেই।
অর্ধশতাব্দী পর হঠাৎ ইজারাগ্রহীতা ও ভূমিদস্যুদের একটি অংশ জেলা প্রশাসনের সঙ্গে মিলে ৩ জুলাই সার্কিট হাউজে বৈঠক করে জমিটির ভাগ-বাটোয়ারার চেষ্টায় নামে। অভিযোগ উঠেছে, মহানগরীর সবচেয়ে দামী এলাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন একসঙ্গে এত জমি থাকাটা অত্যন্ত দুর্লভ হলেও সরকারি জমিকে হাতিয়ে নিতে মরিয়া ভূমিদস্যুরা প্রশাসনের ছত্রছায়া পাচ্ছে।
সনাক ও টিআইবি চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, “প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া চট্টগ্রামে এত বড় দখলের ঘটনা ঘটতে পারে না। মন্ত্রণালয়ের ছায়া না থাকলে এমন জায়গায় শত শত বাড়ি হওয়া সম্ভব নয়।” প্রশাসনের নির্লিপ্ত ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, “যদি প্রশাসন জড়িত না থাকে, তবে এসব বন্ধ হয় না কেন?”
ভূমি আইন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. নওয়াব আসলাম হাবিব বলেন, “এসি ল্যান্ড পদে অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি থাকায় অনেক সময় নিচের কর্মচারীরা তাদের অজ্ঞতার সুযোগ নেয়। ভূমি অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে।” তিনি আরও বলেন, “এই জমিগুলোতে সরকারি অফিস নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে দখল ঠেকানো সম্ভব হবে।”
এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, “ভূমি ব্যবস্থাপনা আমাদের মূল দায়িত্ব। আমরা জানি, কিছু অসৎ কর্মচারীও ভূমিদস্যুদের সঙ্গে জড়িত। তদন্ত চলছে, দোষী প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আশ্বাস দেন, “সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”

