রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছিল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে। ‘দুয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে এই ব্যাংক কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের আগেই এই চুক্তি হয়, যা ছিল নিয়মবহির্ভূত। পরবর্তীতে তদন্তে উঠে আসে, এই চুক্তি ব্যাংকের জন্য ছিল মারাত্মক ক্ষতির কারণ। বর্তমানে চুক্তি বাতিল করে ‘দুয়ার’-এর কার্যক্রম স্থগিত করেছে অগ্রণী ব্যাংকের নতুন বোর্ড।
২০১৩ সালে অগ্রণী ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন আসে ২০১৫ সালের ২৬ অক্টোবর। অথচ এর আগেই, ২০১৫ সালের মে মাসে, ‘দুয়ার সার্ভিসেস’-এর সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করে ব্যাংকটি। চুক্তিপত্রে তারিখ না থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়, এটি অনুমোদনের আগেই হয়েছিল—যা সরাসরি নীতিমালার লঙ্ঘন।
চুক্তির সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে ছিল রাজনৈতিক প্রভাব। ‘দুয়ার’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের পরিবারের। তদন্তে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিকে সুবিধা দিতে করেই এই চুক্তি করা হয়। ২০১৮ সালে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ চুক্তির অনিয়ম জানার পরও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি, বরং দুয়ারকে বাড়তি সুবিধা দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক একে ‘উইন্ডো ড্রেসিং’ হিসেবে উল্লেখ করেছে—অর্থাৎ ভেতরের অনিয়ম ঢাকতে বাহ্যিক সৌন্দর্য প্রদর্শনের অপচেষ্টা।
দশ বছরের বেশি সময় ধরে দুয়ারের সঙ্গে চুক্তির আওতায় ব্যাংক ব্যয় করেছে অন্তত ২২৭ কোটি টাকা। এসব খরচের মধ্যে ছিল স্টেশনারি, আসবাব, কম্পিউটার সামগ্রী থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা পর্যন্ত। ৫৬৭ জন কাস্টমার সার্ভিস প্রোভাইডার (সিএসপি) স্থাপনে এককালীন ৯০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। সফটওয়্যার সাপোর্টের জন্য প্রতিমাসে কখনো ৫৩ লাখ, কখনো ৩৪ লাখ, আবার ১৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বিল দেওয়া হয়েছে—যার কোনো নির্দিষ্ট হিসাব চুক্তিতে ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এসব ব্যয় ছিল চুক্তিবহির্ভূত এবং খাতওয়ারি বিবরণও ছিল না।
নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংককে নিজস্ব সফটওয়্যার ব্যবহার করার কথা থাকলেও অগ্রণী ব্যাংক ‘সেলোস্কোপ’ নামের দুয়ার মালিকানাধীন সফটওয়্যার ব্যবহার করে, যার জন্য প্রতি মাসে ১ কোটি ১ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করে। আরও উদ্বেগের বিষয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সলিউশনে (সিবিএস) যেখানে তৃতীয় পক্ষের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ, সেখানে অগ্রণী ব্যাংক সেই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে দুয়ারকে ওই প্রবেশাধিকার দেয়।
২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি চিঠিতে অগ্রণী ব্যাংককে কড়া ভাষায় আপত্তি জানায় এবং দোষীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে বলে। একই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ব্যাংকের ডাটা সেন্টার ভাড়া করা ভবনে স্থাপিত হলেও দুয়ারকে বাড়তি অর্থ প্রদান করা হয়েছে—প্রতি মাসে ১ লাখ ৭ হাজার টাকা, যা বেআইনি।
অগ্রণী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যাংকের একাধিক প্রভাবশালী সাবেক কর্মকর্তা দুয়ারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। তাদের কেউ কেউ নিজেরা এজেন্ট হয়েছেন, আবার কেউ আত্মীয়স্বজনকে নিয়োগ দিয়েছেন। এতে পাশের শাখাগুলোর গ্রাহক ও লেনদেন কমে গেছে। অভিযোগ আছে, কিছু কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে শাখার লেনদেন সরিয়ে এজেন্ট পয়েন্টে নিয়ে গেছেন—ফলে শাখাগুলোতে লোকসান বাড়ে।
দুয়ারের এজেন্ট পয়েন্ট থেকে গ্রাহকের প্রায় ৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে তদন্তে। এ কারণে ২০২৫ সালের ১৯ জুন মেয়াদ শেষ হওয়া চুক্তি নবায়নের আগে কিছু শর্ত দেয় অগ্রণী ব্যাংক। কিন্তু দুয়ার তা মানতে রাজি হয়নি। ফলে ২২ জুন থেকে দুয়ারের সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে অগ্রণী ব্যাংক। ৫৬৭টি এজেন্ট পয়েন্টও বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাংক জানিয়েছে, এখন থেকে গ্রাহকরা আগের মতোই সরাসরি ব্যাংকের শাখা থেকে সেবা পাবেন।
২০২১ ও ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর তারিখের দুই পরিদর্শন প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক দুয়ারকে দেওয়া বাড়তি সুবিধা ও অনিয়ম তুলে ধরে। ২০২৩ সালের আগস্টে অগ্রণী ব্যাংকের এমডিকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে বলা হলেও সময়মতো উত্তর না মেলায় ফের তাগাদা পাঠানো হয়। পরে ব্যাংক জানায়, একটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হবে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভিযোগ, নিরীক্ষায় এখনো খাতওয়ারি ব্যয়, তুলনামূলক বিশ্লেষণ বা অতিরিক্ত অর্থ ফেরত আনার বিষয় নেই।
অগ্রণী ব্যাংক জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে নিজস্ব সফটওয়্যার তৈরি করেছে। শিগগিরই তাদের নিয়ন্ত্রণে নতুন করে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করা হবে। ব্যাংকটি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আর কোনো তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভর করবে না। দুয়ারের অনিয়ম প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, “আগের বোর্ডের আমলে বিভিন্ন অনিয়ম হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আমাদের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও তা প্রমাণিত। অনিয়ম বন্ধ ও সেবার মান উন্নয়নের জন্য আমরা কিছু শর্ত দিয়েছিলাম। কিন্তু দুয়ার তা মানেনি, তাই চুক্তি নবায়ন করিনি।”
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “দুয়ারের অনেক এজেন্টই ছিল আমাদের সাবেক কর্মকর্তা। তাদের প্রভাবে ব্যাংকের শাখাগুলো ক্ষতির মুখে পড়ে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। তাই নতুন চুক্তির আগে শর্ত দিয়েছিলাম, তারা না মানায় চুক্তি বাতিল হয়েছে।” বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “দুয়ারের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত অগ্রণী ব্যাংকের নিজস্ব। তবে তারা যেভাবে সেবা নিচ্ছিল, সেটা আইনসম্মত ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদনে তা উঠে এসেছে। আমরা আশা করছি, ব্যাংকটি নিজস্ব সক্ষমতায় কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারবে।”

