আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা সাইফুজ্জামান বুদ্ধিমান ও দুর্নীতিপরায়ণ। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত বিপুল সম্পদ বিদেশে পাচার করেছেন তিনি। তার সম্পদের পাহাড় গড়া হয়েছে প্রধানত যুক্তরাজ্যে। সাইফুজ্জামান চৌধুরী সেখানে পাচার করেছেন পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি। যুক্তরাজ্যের আবাসন খাতে তার বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে তার কিছু সম্পদ জব্দ করা হয়েছে, তদন্ত চলছে।
তদন্তে দেখা গেছে, সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নামে যুক্তরাজ্যে রয়েছে ৩৬০টি বাড়ি। এর বেশির ভাগই শীর্ষ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বার্কলি গ্রুপ থেকে কেনা। এই বাড়িগুলোর মূল্য ৪০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় চার হাজার আটশো কুড়ি কোটি টাকার বেশি। ২০১৯ সালে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার ‘দ্য মিনিস্টার্স মিলিয়নস’ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রথমবার এই তথ্য উঠে আসে।
লন্ডনে সাইফুজ্জামানের সম্পদ দেখাশোনা করেন চট্টগ্রামের রিপন মাহমুদ। তিনি লন্ডনে তার পক্ষে কাজ করেন। সাইফুজ্জামান সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। ওই ব্যাংকের কর্মী রাহুল মার্টের বর্ণনায়ও তার সম্পদের পরিমাণ উঠে এসেছে। কীভাবে এত সম্পদ গড়েছেন তার ধারণাও পাওয়া গেছে।
সাইফুজ্জামান ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার খুব ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি। ২০১৪ সালে তিনি সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হন। ২০১৯ সালে পদোন্নতি পেয়ে ভূমিমন্ত্রী হন। আলজাজিরাকে তিনি বলেছেন, “আমার বাবা প্রধানমন্ত্রীর খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সত্যি বলতে আমিও।” আলজাজিরার অনুসন্ধানী দলের সামনে তিনি বিলাসী জীবনযাত্রার গল্পও বলেছেন। নিজের জুতার বর্ণনায় বলেন, “এগুলো টেইলর-মেড, বিশেষ অর্ডারে তৈরি। প্রতি জুতার দাম তিন হাজার পাউন্ডের বেশি। এটি তৈরি হতে চার মাস সময় লাগে।”
জুতা তৈরির বর্ণনায় জানান, “উটপাখি ও কুমিরের বুকের চামড়া দিয়ে তৈরি। সম্পূর্ণ বুকের চামড়ার দাম ছয় হাজার পাউন্ড। আর অর্ধেক কুমির ও অর্ধেক বাছুর চামড়ার জুতা তিন হাজার পাউন্ড।” স্যুটের প্রতি আগ্রহ জানিয়ে সাইফুজ্জামান বলেন, “প্রতি লন্ডন সফরে ‘সুপার ২০০’ স্যুট কিনি। দাম ৬ থেকে ৮ হাজার পাউন্ড। কেনালি বন্ড স্ট্রিট থেকে বাসায় পাঠানো হয়।”
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা সরকারের শাসনকালে তারা সাইফুজ্জামানকে নিয়মিত অনুসরণ করছিল। তার বার্ষিক বেতন ছিল মাত্র ১৩ হাজার ডলার, অথচ যুক্তরাজ্যে তিনি গড়েছেন বিশাল সম্পদের সাম্রাজ্য। লন্ডনে বাড়ি কেনার জন্য তিনি ডেভেলপারদের মাধ্যমে অনেক কোম্পানি তৈরি করেছেন। ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ২৬৫টি বাড়ি কেনেন। বাড়ির বেশির ভাগই শীর্ষ ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান থেকে। ২০২০ সালে আরো ৮৯টি বাড়ি কিনে মোট বাড়ির সংখ্যা হয় ৩৬০টি।
রিপন মাহমুদ বলেন, “আমাদের গ্রাহকের লন্ডনে ৩০০টির বেশি বাড়ি আছে। তিনি লন্ডনে এসে কয়েকটি বাড়ি কিনে চলে যান। লকডাউনেও নতুন বাড়ি কেনায় ২০ কোটি পাউন্ড খরচ করেছেন।” রিপন মাহমুদ সাইফুজ্জামানের ভাই ও প্রধান লোক। সাইফুজ্জামানও বলেছেন, “লন্ডন ও যুক্তরাজ্যের সব সম্পত্তি রিপনের মাধ্যমে কেনা।” ২০২২ সালে লন্ডনের উত্তর-পশ্চিমে একটি প্রপার্টি ১১ মিলিয়ন পাউন্ডে বিক্রি হয়েছে। রিজেন্ট পার্ক থেকে মাত্র কিছুটা দূরে। লর্ডস ক্রিকেট স্টেডিয়ামের কাছাকাছি এই এলাকাটি লন্ডনের সবচেয়ে দামি এলাকাগুলোর একটি। এখানে সাদা রঙের বাড়ি, মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত জানালা, সর্পিলাকৃতির সিঁড়ি, সিনেমা হল ও জিমনেসিয়াম আছে। এই প্রপার্টির মালিক সাইফুজ্জামান চৌধুরী। যুক্তরাজ্যে তার মোট সম্পদ প্রায় ২০০ মিলিয়ন পাউন্ড, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দুই হাজার সাতশ কোটি টাকা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, কোম্পানি হাউসের করপোরেট অ্যাকাউন্ট, বন্ধকি চার্জ ও ল্যান্ড রেজিস্ট্রি লেনদেন বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে। তার সম্পদের মধ্যে সেন্ট্রাল লন্ডনের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট থেকে টাওয়ার হ্যামলেটসের আবাসন, লিভারপুলে শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক ভবন রয়েছে। ব্লুমবার্গ অনুসারে, সাইফুজ্জামান যুক্তরাজ্যে প্রায় ২৫০টির বেশি প্রপার্টির মালিক। এসব সম্পত্তি কেনার সময় যুক্তরাজ্যে তীব্র আবাসন সংকট চলছিল। লেনদেনের অধিকাংশই নতুন তৈরি বাড়ি।
রুশ ধনকুবেরদের সম্পদ যুক্তরাজ্যে লুকানোর সমালোচনার মাঝে ব্রিটিশ সরকার বিদেশি মালিকানার স্বচ্ছতা বাড়াতে চাইছিল। ইউক্রেনে মস্কোর আগ্রাসনের পর তা আরও জরুরি হয়ে ওঠে। ব্লুমবার্গ নিউইয়র্কে তার অন্তত পাঁচটি সম্পত্তির তথ্যও পেয়েছে। এসব সম্পত্তি ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৬ মিলিয়ন ডলারে কেনা হয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রাকনির্বাচনী ঘোষণায় সাইফুজ্জামান তার মোট সম্পদের পরিমাণ ২৫৮.৩ মিলিয়ন টাকা (২.৪ মিলিয়ন ডলার) ও স্ত্রীর সম্পদ ৯৯৩ হাজার ডলার জানিয়েছেন। তবে যুক্তরাজ্যের সম্পদ তিনি বাংলাদেশে ঘোষণা করেননি।
আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশ ত্যাগ করে দুবাই চলে যান সাইফুজ্জামান চৌধুরী। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে যুক্তরাজ্যের জাতীয় অপরাধ সংস্থা (এনসিএ) তার মালিকানাধীন সম্পত্তি জব্দ করেছে। এসব সম্পদ বিক্রি করতে পারবেন না তিনি।

