নরসিংদীর সাবেক সংসদ সদস্য জহিরুল হক ভূঁইয়া মোহনের মালিকানাধীন তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান বি ব্রাদার্স লিমিটেড কাঁচামাল আমদানির নামে জাল এফওসি (ফ্রি অব কস্ট) সনদ ব্যবহার করে সরকারের ৬৬ কোটি টাকার শুল্ক ও কর ফাঁকি দিয়েছে।
সাবেক আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি মোহন গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে পলাতক। তার অনুপস্থিতিতেই প্রতিষ্ঠানটি কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর ওয়েবসাইটে জাল প্রত্যয়নপত্র আপলোড করে সাড়ে ১৩ লাখ কেজি কাপড় আমদানি করে। সময়টা ছিল ২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
অভ্যন্তরীণ তদন্তে জানা যায়, এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি কোনো অনুমোদন না নিয়েই এফওসির জাল সনদ ব্যবহার করেছে। এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বন্ড কমিশনারেটের সিস্টেম অ্যানালিস্ট গোলাম কবির। তদন্তে উঠে আসে, তার সহায়তায় ৫৫টি চালানে মোট ৭৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকার পণ্য আমদানি করা হয়। এর বিপরীতে ফাঁকি দেওয়া শুল্কের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
প্রতিষ্ঠানটি পণ্য খালাসে যে সনদ ব্যবহার করেছে, তা বাস্তবে অনুমোদিত নয়। কোনো আবেদনপত্র না থাকলেও ওয়েবসাইটে আপলোড করা ছিল এফওসির জাল সনদ। সাধারণত এ ধরনের আপলোডের জন্য উপকমিশনারের সুপারিশ ও রেজিস্টারে এন্ট্রি থাকতে হয়। কিন্তু এসব কিছুই ছিল না। সিস্টেম অ্যানালিস্ট নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি কোনো অনুমোদন ছাড়াই আপলোড করেছেন এবং ভবিষ্যতে এমন ভুল আর হবে না বলে তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বন্ড কমিশনারেট দক্ষিণে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সেই সুযোগই কাজে লাগিয়েছে বি ব্রাদার্স লিমিটেড। জালিয়াতির বিষয়ে জানতে সাবেক এমপি মোহনের মোবাইলে কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার অনুপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমি কোম্পানির ভ্যাট-ট্যাক্সের বিষয় দেখি না। তাই কর ফাঁকির বিষয়ে কিছু জানি না।” এ বিষয়ে অন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তির নাম বা নম্বরও দিতে রাজি হননি তিনি।
তদন্ত কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, এই ঘটনায় বি ব্রাদার্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা উচিত। পাশাপাশি গোলাম কবিরের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আর প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে বন্ড সুবিধা অপব্যবহারের মাধ্যমে ফাঁকি দেওয়া ৬৭ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।
এর আগেও অনিয়মে জড়িত ছিল প্রতিষ্ঠানটি। ২০২০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির সময় শেয়ারমানি ডিপোজিট নির্ধারিত ব্যাংকে না রেখে একাধিক ব্যাংকে রাখে তারা, যা আইপিওর শর্ত ভঙ্গ করে। তখন আর্থিক প্রতিবেদনে লাভ বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তাদের আইপিও আবেদন বাতিল করে।
বি ব্রাদার্সের মালিক জহিরুল হক মোহন আওয়ামী লীগ ঘরানার ব্যবসায়ী। তিনি ১৯৯৬ সালে রূপগঞ্জের বরপায় প্রতিষ্ঠা করেন তৈরি পোশাক কারখানা বি ব্রাদার্স লিমিটেড। কোম্পানিটির দুইটি ইউনিট রয়েছে। তিনি দুই দফা আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ছিলেন। সর্বশেষ তিনি নরসিংদী-৩ আসনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মনোনীত হয়ে এমপি হন।

