শুল্কসহ কেজি প্রতি ২৫০ টাকায় চীন থেকে আমদানি করা লাল আঙুর দেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায়। সরাসরি খরচ ও লাভসহ এটি ৩৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া উচিত ছিল।
গত ২২ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চীন থেকে ২০ হাজার কেজি লাল আঙুর আমদানি করেছে এনটিসি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিলসি থেকে ১৮ হাজার ৬৮৫ ডলার বা ২২ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭০ টাকার এলসি করা হয়েছিল।
চালানে কাস্টমসের শুল্ককর এসেছে ২৮ লাখ ১৪ হাজার ১৭৯ টাকা। ২০ হাজার কেজির আঙুর আমদানিতে মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ৫০ লাখ ৯৩ হাজার ৭০৯ টাকা। পরিবহন ভাড়া, শ্রমিক খরচ, লাভসহ প্রতি কেজিতে ১০০ টাকা করে আরও ২০ লাখ টাকা যোগ করলে মোট খরচ হয় ৭০ লাখ টাকা। এর অর্থ বাজারে প্রতি কেজি আঙুর বিক্রি হওয়া উচিত ছিল ৩৫০ টাকা।
তবে বাস্তবে দাম অনেক বেশি। একইভাবে আপেলের আমদানিতে প্রতি কেজিতে খরচ পড়ে ১৯০ টাকা। ১০০ টাকা যোগ করলে বিক্রি হওয়া উচিত ছিল ২৯০ টাকা। মালটার আমদানিতে খরচ পড়ে ২৪০ টাকা, যার সঙ্গে ১০০ টাকা যোগ করলে বিক্রি দর হয় ৩৪০ টাকা। এসব দামই সাধারণ ক্রেতার জন্য গ্রহণযোগ্য। কিন্তু মুনাফা বাড়ানোর জন্য বিদেশি ফল বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
চট্টগ্রামের পাঁচ আমদানিকারকের যোগসাজসে বিদেশি ফলের দাম বেড়েছে। তারা চালান বন্দরে নামার পর থেকেই পাইকারি দামের বিষয়টি ঠিক করে দেয়।
‘আল্লাহর রহমত স্টোর’ (হাজি মোহাম্মদ কামাল), ‘পায়েল ট্রেডিং’ (প্রশান্ত সরকার), ‘চট্টগ্রাম ফল বাণিজ্য’ (জাকির হোসেন), ‘এনএইচ ইন্টারন্যাশনাল’ (আলী হোসেন আরিফ) ও ‘আঁখি এন্টারপ্রাইজ’ (তৌহিদুল আলম) এই পাঁচ প্রতিষ্ঠান মূল অভিযোগের মুখে।
গত এক মাসে বিদেশি আট ধরনের ফলের দাম বেড়েছে ১৬ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে। আনার বা ডালিমের দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশ, চায়না কমলা ২৫ শতাংশ, মালটা ২৫ শতাংশ, নাশপাতি ১৬.৬৬ শতাংশ, আঙুর ২০ শতাংশ ও আপেল ২০ শতাংশ।
জুলাই থেকে আপেল, কমলা, মালটা, আঙুর, নাশপাতি ও ডালিমের দাম দ্রুত বেড়েছে। এর আগে মে মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধির প্রভাব বিদেশি ফলের দামে পড়েছিল। যদিও পরে শুল্ক কমানোর ফলে দাম কিছুটা কমে আসে। কিন্তু জুলাই মাসে আবার দাম বেড়ে গেছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা আমদানিকারকদের যোগসাজিকে দায়ী করছেন।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন ফলের দোকানে ডালিমের দাম বেড়ে ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা, চায়না কমলা ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, মালটা ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা, কেনো ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, আপেল ২৮০ থেকে ৪০০ টাকা, নাশপাতি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা ও কালো আঙুর ৪০০ থেকে ৫৫০-৬০০ টাকা হয়ে গেছে।

ফল ব্যবসায়ীরা জানান, আমদানিকারক থেকে আড়তদাররা কমিশন নিয়ে ফল ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন। আমদানিকারকরা দাম নির্ধারণ করলে খুচরা বাজারেও দাম বাড়ে। জুলাই মাস থেকে এই প্রক্রিয়ায় দাম বেশি বাড়ানো হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে বিদেশি ফলের দাম। আমদানিকারকরা বলছেন, বাজারে আমদানিকৃত ফল পর্যাপ্ত রয়েছে। অনেক সময় লোকসান নিয়ে বিক্রি করতে হয়। বাজার চাহিদার ওপর দাম ওঠানামা করে। তারা কারসাজির অভিযোগ অস্বীকার করেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কর্মকর্তা সৈয়দ মুনিরুল হক বলেন, বিদেশি ফলের আমদানিতে শুল্ক কমানোর পরও ক্রেতারা সুবিধা পাচ্ছেন না। ব্যবসায়ীরা নানা কারসাজি করে দাম বাড়াচ্ছেন যা অনৈতিক।
খুচরা ব্যবসায়ী আকবর বলেন, পাইকারিতে ফলের দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরায় বিক্রি বাধ্যতামূলক বেড়ে গেছে। কাজীর দেউড়ির ব্যবসায়ী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিদেশি ফল এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।’
বাংলাদেশ কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন (ক্যাব) চট্টগ্রামের প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসেন বলেন, দেশে সিন্ডিকেট ছাড়া কোনো সেক্টর নেই। ফল ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা বড় সিন্ডিকেট গঠন করে দাম বাড়িয়ে নিচ্ছে। গত এক মাসে তাদের পকেটে গিয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা।

