দেশে ধান ও চালের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রতি মৌসুমে ভালো ধানের ফলন, পর্যাপ্ত মজুত এবং চাল মিল কার্যক্রম চালু থাকা সত্ত্বেও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। কুষ্টিয়া ও নওগাঁর মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কয়েকজন প্রভাবশালী রাইস মিল মালিক বাজার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাদের সিন্ডিকেট ও কৌশলগত দখলের কারণে চালের দাম বাড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক, ক্ষুদ্র চালকল মালিক, খুচরা ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তা।
কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকাম দেশের অন্যতম বড় চালের কেন্দ্র। এখানে ৬৪টি অটো রাইস মিল থাকলেও মাত্র ১০ জন প্রভাবশালী মালিক ১৮টি মিলের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। গোল্ডেন রাইস মিল তাদের মধ্যে অন্যতম। প্রতিষ্ঠানটি সরু চাল উৎপাদন করে এবং গত এক বছরে কেজিপ্রতি বাজার মূল্যের ৩-৪ টাকা বেশি দামে চাল বিক্রি করেছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে তাদের চালের দাম কেজিপ্রতি ৮২ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। কোরবানির ঈদের পর ধানের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে এক মাসের ব্যবধানে তারা কেজিপ্রতি আরও ৬-৮ টাকা বাড়ায়। এতে এক মাসে কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত লাভের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি খাদ্য বিভাগ, বাজার মনিটরিং সংস্থা ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
গোল্ডেন রাইস মিলের কর্ণধার জিহাদুজ্জামান জিকু বলেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তরবঙ্গের অনেক প্রতিষ্ঠান আরও বেশি দামে চাল বিক্রি করছে। আমাদের চালের মান ভালো হওয়ায় উৎপাদন খরচ বেশি, তাই দাম নির্ধারণ করা হয়। আমরা মান বজায় রেখে সীমিত লাভে বিক্রি করি।” তবে ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, প্রায় সমমানের চাল অন্য প্রতিষ্ঠান কম দামে বিক্রি করছে। বড় ব্র্যান্ডের নামের কারণে বেশি দাম নেওয়া হয়।
সুবর্ণা অ্যাগ্রো ফুড গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানও বাজারে বেশি দামে চাল বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা করছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির মাসিক ছাঁটাই সক্ষমতা ৪,৬০০ মেট্রিক টন এবং ধান মজুত রাখার ক্ষমতা প্রায় ৭,০০০ মেট্রিক টন। অতিরিক্ত দামে বিক্রি ও অবৈধ মজুতের অভিযোগে তাদের একাধিকবার জরিমানা করা হয়েছে। মালিক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, “দেশে ধানের কোনো সংকট নেই। কিছু মানুষ ধান কিনে গুদামে রাখে, তাই ঈদের পর দাম বেড়ে যায়। মানুষের আয় বাড়ায় দাম বাড়া স্বাভাবিক। মান অনুযায়ী দাম বৃদ্ধি হওয়া জরুরি।”
খাজানগর মোকামের বড় অটো মিলগুলো বিপুল মজুত ক্ষমতা রাখে। সালাম অটো রাইস মিলের দুটি প্রতিষ্ঠানের চাল মজুত ক্ষমতা ৩,৩২০ টন এবং ধান মজুত ক্ষমতা প্রায় ১০,০০০ টন। স্বর্ণা, প্রগতি, আহাদ, হালিম, রশিদ, দেশ, গোল্ডেন ও জাফর এগ্রো ফুড মিলগুলোও বিপুল পরিমাণ চাল ও ধান মজুত রাখতে পারে। এদের অনেকেই ব্র্যান্ডের অজুহাতে দাম বাড়িয়ে শতকোটি টাকা অতিরিক্ত লাভ করছে।
কুষ্টিয়ার স্থানীয় হাসকিং (ম্যানুয়াল) চালকলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পাঁচ বছর আগে খাজানগরে প্রায় ৩০০টি হাসকিং মিল ছিল, এখন অধিকাংশ বন্ধ। মোমিনুল ইসলাম, ৩০ বছর ধরে ব্যবসায় জড়িত, বলেন, “বড় মিল মালিকদের অর্থ ও পলিসির কারণে ছোটরা টিকতে পারছে না। ব্যাংক শুধু অটো মিল মালিকদের ঋণ দেয়। ছোট মিল মালিকদের সুযোগ নেই।”
জাহিদ অটো মিলের ম্যানেজার আবদুর রাজ্জাক বলেন, “আমরা বড় ব্র্যান্ড না হলেও সমমানের চাল কম দামে বিক্রি করি। বড় ব্র্যান্ডগুলো একই চাল ৪-৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি করে।” বাজারে কাজ করা ব্যবসায়ী আবদুল কদ্দুস জানান, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের শুরুতেই বিপুল ধান মজুত রাখে। এতে তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে এবং ভোক্তাদের পকেট থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। খুচরা ব্যবসায়ীরাও অভিযোগ করেছেন, বড় মিলের চাল কেজিতে ৪-৫ টাকা বেশি দামে কিনতে হয়। নিশান আলী বলেন, “ব্র্যান্ডের চাল না রাখলে বিক্রি হয় না। একই মানের চাল অখ্যাত প্রতিষ্ঠান কম দামে বিক্রি করছে।”
নওগাঁয়ও একই চিত্র। বছরে তিনবার ধান তোলা হলেও চালের দাম কমে না। চলতি বোরো মৌসুমে ৫০ কেজির বস্তায় চালের দাম ১৫০-৩০০ টাকা। নওগাঁ, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জে বড় রাইস মিল স্থাপন করে করপোরেট ব্যবসায়ীরা হাট থেকে ধান কিনে মজুত রেখে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
মাতাজি হাটের আড়তদার জলিল মিয়া জানান, মৌসুম শুরু হতেই বড় মিলাররা কমিশন এজেন্ট বসিয়ে ধান কিনে রাখে এবং সংকট তৈরি করে দাম বাড়ায়। নওগাঁ জেলা ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক জয়নাল আবেদীন মুকুল বলেন, “মিলাররা কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে মজুত করে এবং চাল তৈরি করে অনেক বেশি দামে বিক্রি করছেন। সঠিক তদারকি না থাকায় সিন্ডিকেট বারবার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।”
নওগাঁর রাইস মিলার গোলাম মোস্তফা বলেন, “মোট উৎপাদিত সরু চালের ৮০-৮৫ শতাংশ বড় মিলারদের হাতে থাকে। বাজারে কোন দামে বিক্রি হবে, তা তাদের সিন্ডিকেট নির্ধারণ করে। তাই ছোট মিলাররা টিকতে পারছে না। দেশের বাজারে চালের দামও কমছে না।”
সরকারি কর্মকর্তারাও সীমাবদ্ধতা স্বীকার করছেন। কুষ্টিয়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আল ওয়াজিউর রহমান বলেন, “আমরা চেষ্টা করি চালকলগুলোকে নজরদারিতে রাখতে। জনবলসংকট ও কিছু দুর্বলতার কারণে সবসময় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তবে উৎপাদন খরচ ও বাজার দামের পার্থক্য বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”
জেলা কৃষি বিপণন দপ্তরের সিনিয়র কর্মকর্তা সুজাত হোসেন খান বলেন, “খাজানগরের কিছু প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর ধানের দাম বাড়িয়ে সিন্ডিকেট করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সাধারণ ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিল ও চাল জব্দের মতো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা জরুরি।”
জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন প্রধানও স্বীকার করেছেন, “কিছু অসাধু মিল মালিকের কারণে সৎ ব্যবসায়ী ও ছোট চালকল মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।”

