যশোরের রাজনীতির মাঠে প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এমনকি হানাহানি ছিল নিয়মিত বিষয়। তবুও প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রধান নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সৌহার্দ চোখে পড়ার মতো। স্বাধীনতা-পরবর্তী দীর্ঘ সময় ধরে এখানকার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন তরিকুল ইসলাম, খালেদুর রহমান টিটো ও আলী রেজা রাজু।
এই তিন নেতা নির্বাচনে পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছেন। কেউ জিতেছেন, কেউ হেরেছেন। তবু তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক বজায় ছিল মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত। বন্ধুত্ব ও সম্মান রাজনীতির ওপর ছিল প্রভাবশালী কিন্তু পরিস্থিতি ইউটার্ন নেয় ২০০৯ সালে যখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসে। তখন প্রবীণ নেতৃত্বকে সরিয়ে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে ওঠেন যারা রাজনৈতিক সংস্কৃতি বোঝেন না। প্রতিপক্ষের বাড়ি-ঘর ও কার্যালয়ে বোমা হামলা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যা, মিছিল-সমাবেশে আক্রমণ হয়ে ওঠে নৈমিত্তিক ঘটনা।
সরকারের মনোরঞ্জনে উদগ্রীব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও রাজনৈতিক ক্যাডারদের সঙ্গে অংশ নেয়। সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী রাজনীতি স্থানীয় নেতাদের চোখে ‘অন্ধকার সময়’ হিসেবে মনে হয়েছে। এই সময়কালে আগের সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি উবে যায়। নিপীড়ন ও নির্যাতনের পরিসংখ্যান রেকর্ড ভাঙে। দলীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সাড়ে ১৫ বছরে প্রধান বিরোধীদল বিএনপির ৬৮ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা অগণিত। জামায়াতে ইসলামীর ১০ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। ছাত্র শিবিরের এক নেতা এখনও গুম।

পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন অন্তত ৫৫০ জন। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ৫৫ জন নেতাকর্মী। এই সময় বিএনপি ও জামায়াতের বহু নেতাকর্মীর ঘর-বাড়ি আক্রান্ত হয়েছে। বছরের পর বছর তারা বাড়িতে নিরাপদে থাকতে পারেননি। জেলাজুড়ে দুই দলের নেতাকর্মীদের নামে অন্তত ২২০০টি গায়েবি মামলা করা হয়েছে। মামলায় আসামি হয়েছেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির প্রয়াত নেতা তরিকুল ইসলাম, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আজীজুর রহমান এবং তৃণমূলের হাজার হাজার নেতাকর্মী। কোনো কোনো নেতাকর্মী জেল খেটেছেন ২৫–৩০ বার পর্যন্ত।
যশোরের পাবলিক প্রসিকিউটর সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু জানান, হাসিনার নেতৃত্বে সাড়ে ১৫ বছরে যশোরে প্রায় ২,২০০টি ‘গায়েবি’ ও ‘রাজনৈতিক মামলা’ হয়েছে। অধিকাংশ মামলা কথিত নাশকতার অভিযোগে দায়ের করা হয়েছিল। বাদী হিসেবে পুলিশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও থাকতেন। বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা তরিকুল ইসলাম ও জামায়াতের মাস্টার নূরুন্নবী এমন বহু নাশকতার মামলায় জড়িত ছিলেন। পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, তরিকুল ইসলাম মৃত্যুর আগে রাজধানীর ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে অ্যাম্বুলেন্সে হাইকোর্টে নিয়ে জামিনের আবেদন করা হয়। গুরুতর অসুস্থ শীর্ষ রাজনীতিকের ওপর এমন জুলুম ইতিহাসে বিরল। যশোরাঞ্চলে বিএনপির প্রধান নেতা অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের নামে যশোর, ঢাকা ও নড়াইল মিলে সর্বাধিক ৭৮টি মামলা হয়।
এর মধ্যে কিছু মামলা দুই থেকে চার ভাগে বিভক্ত থাকায় মোট সংখ্যা ১৫০-এরও বেশি। এছাড়া জেলা সভাপতি সাবেরুল হক সাবুর নামে ৬৪টি, সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকনের নামে ৬০টির বেশি মামলা হয়। জেলার মধ্যম পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে ২০ থেকে ৫০টি মামলা দাখিল করা হয়। এর মধ্যে সাংগঠনিক সম্পাদক মুনির আহমেদ সিদ্দিকী বাচ্চুর নামে কথিত ক্রসফায়ারের মামলাও রয়েছে। জামায়াতের নেতাকর্মীদের নামে প্রায় ১,২০০টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩৫০টি মামলা আদালতে খারিজ হয়েছে। ‘রাজনৈতিক মামলা’ হিসেবে ৫৭৭টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
শীর্ষ ও মধ্যম পর্যায়ের এমন কোনো নেতা নেই, যার নামে মামলা হয়নি বা জেল খাটেননি। দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আজীজুর রহমান, জেলা আমির অধ্যাপক গোলাম রসুল, প্রয়াত আমির মাস্টার নূরুন্নবী, সহকারী সম্পাদক অধ্যাপক গোলাম কুদ্দুসসহ অনেকের নামে ১৫ থেকে ২৫টি মামলা রয়েছে। যশোরের পাবলিক প্রসিকিউটর জানান, হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রায় ৫৩০টি ‘রাজনৈতিক মামলা’ প্রত্যাহার হয়েছে। কিছু ‘ভুয়া’ মামলা থাকলেও প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিচারিক প্রক্রিয়ায় এসব মামলার আসামিরা খালাস পাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। এসব মামলায় শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীরা আসামি ছিলেন।

যশোর জেলা বিএনপির অর্থবিষয়ক সম্পাদক ও ঝিকরগাছা উপজেলা কমিটির সভাপতি নাজমুল ইসলাম ছিলেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। ২০১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাত ১২টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার কাছে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তাকে অপহরণ করে। ১৫ ডিসেম্বর ভোরে তার মরদেহ গাজীপুরের দক্ষিণ শালনা এলাকায় ‘পাকিস্তান গার্মেন্টস’-এর সামনে মহাসড়কের পাশে পাওয়া যায়। তাকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
নাজমুল ইসলামের সহধর্মিণী সাবিরা নাজমুল মুন্নি এখন ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মুন্নি বলেন, “তখনকার সরকারপ্রধানের আক্রোশের শিকার ছিলেন আমার স্বামী। সেই সময়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহালের দাবিতে দেশব্যাপী রোডমার্চ করছিলেন। ২৬-২৭ নভেম্বর ছিল খুলনা অভিমুখী রোডমার্চ। শেখ হাসিনা তখন বলেছিলেন, ‘খালেদা জিয়ার রোডমার্চে কারা যায়, সব নোট করা হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ আমার স্বামী বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীসহ যশোর থেকে রোডমার্চে যুক্ত ছিলেন। এর মাত্র ১৭ দিনের মাথায় নাজমুলকে অপহরণ, গুম ও হত্যা করা হয়।”
মুন্নি বলেন, “পুলিশের এলিট ফোর্সের একটি গ্রুপ এই অপরাধে জড়িত। সঙ্গে আওয়ামী লীগের লোকজনও জড়িত থাকতে পারে। আজও আমরা হত্যার বিচার পাইনি। মোহাম্মদপুর থানা আমাদের এজাহার নিতে চায়নি। তিন-চারবার কাটা-ছেঁড়ার পর পুলিশ যে এজাহার গ্রহণ করেছে, তাতে সুনির্দিষ্ট কাউকে অভিযুক্ত করতে পারিনি।” নির্যাতন ও হত্যার এই ধারা যশোরে নতুন নয়। কেশবপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও জেলা কমিটির সহ-সভাপতি, ইউপি চেয়ারম্যান আবু বকর আবু ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে ঢাকা গিয়েছিলেন মনোনয়নপত্র সংগ্রহের জন্য।
তিনি হোটেল মেট্রোপলিটনে উঠেছিলেন। ১৮ নভেম্বর রাত ৮টার দিকে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তাকে হোটেলের নিচ থেকে অপহরণ করে। কিছু সময় পর আবু নিজের ভাইপোকে ফোন করে জানান, “আমি এখন রমনা পার্কের কাছে আছি। এরা মনে হয় আমাকে মেরে ফেলবে। এর পরদিন দুপুরে কেরানীগঞ্জ চর খেজুরবাগ এলাকায় ‘বেবি সাহেবের ডকইয়ার্ডের’ কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে ভেসে ওঠে আবু বকর আবুর মরদেহ। নিহত আবুর ভাই মো. আবুল কাশেম দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় এজাহার দেন। কিন্তু হত্যাকারীরা এখনও অধরা।
মামলাটি দেখভালের দায়িত্বে থাকা কেশবপুর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির সুমনসহ পরিবারটি দাবি করেন, সরকারি বাহিনী এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এ কারণে পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) খুনিদের শনাক্তে উদ্যোগী হয়নি। টার্গেট কিলিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা শিকার হন। যশোর শহরের খড়কী এলাকার হাফেজ মোয়াজ্জেমুল হক ওরফে নান্নু হুজুর ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিতে গিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে যশোর নূতন উপশহরে তার বাড়ির পাশে থাকতেন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। সেই সূত্রে নান্নু ও তার পরিবার তার কর্মকাণ্ড ভালোভাবে জানতেন।

নান্নুর স্ত্রী ও কন্যারা জানান, তথাকথিত মানবতাবিরোধী মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষী হওয়ায় নান্নু টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হন। ওই রাতে রাজধানীর কাকরাইল মসজিদের পাশে তাকে কয়েক পুলিশ সদস্য ঘিরে ধরে পিটিয়ে দুই পা ভেঙে দেয় এবং ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে পেট ও বুকের মধ্যে। ছয়দিন পর, ১১ মে, তিনি মারা যান। মরদেহ বিনা গোসল গভীর রাতে মাটিচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয়দের ক্ষোভের মুখে পুলিশ তাকে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী জানাজার পর দাফন করতে বাধ্য হয়। তবে নান্নুকে জামায়াত ছাড়াও বিএনপি ও হেফাজতে ইসলামও তাদের কর্মী দাবি করে। দল ও সংগঠনগুলো পরিবারটিকে কিছু সহযোগিতা করেছে। কিন্তু একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি কঠিন দুর্দশায় পড়েছে, জানিয়েছেন নান্নুর মেয়ে উম্মে সাদিয়া।
যশোরে খুন ও হত্যার শিকার নেতাকর্মীরা ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারের দুঃশাসনের সময়ের খণ্ডচিত্র। ওই সময় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ছাড়াও হাজারো সাধারণ মানুষ জুলুমের শিকার হন আওয়ামী সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে। যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন জানান, হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের দুঃশাসনে জেলায় তাদের ৬৮ নেতাকর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। তিনি নিহত নেতাকর্মীদের তালিকাও সরবরাহ করেছেন। তালিকায় নাজমুল ইসলাম, আবু বকর আবু ছাড়াও আরও সুপরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ নেতা রয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন:
- যশোর জেলা বিএনপির যুগ্ম-সম্পাদক আবদার ফারুক
- সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ফেরদৌস হোসেন
- চৌগাছা উপজেলা কমিটির চার সহ-সভাপতি: নজরুল ইসলাম শান্তি, মকবুল হোসেন, ইমান আলী ও আব্দুল খালেক
- অভয়নগর উপজেলার সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক
- নওয়াপাড়া পৌর কমিটির সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান, যুগ্ম-সম্পাদক মিন্টু পাটোয়ারী
- বাঘারপাড়া পৌর কমিটির যুগ্ম-আহ্বায়ক বদিয়ার রহমান
- ঝিকরগাছা উপজেলার সহ-সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান শওকত আলী, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শাহাদত হোসেন
যশোরে অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন ও জামায়াতের নেতাদের ওপর হত্যাকাণ্ড:
বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মধ্যে যশোর জেলা যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি বদিউজ্জামান ধনী, সাংগঠনিক সম্পাদক আশিকুর রহমান আকুল, শার্শার লক্ষণপুর ইউনিয়ন সভাপতি সলেমান হোসেন, পুটখালী ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক, বেনাপোল ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী এবং জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি কবির হোসেন পলাশ খুন হয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামী যশোর জেলা শাখার প্রচার সেক্রেটারি অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন বিশ্বাস জানান, নান্নুর পাশাপাশি হাসিনার শাসনামলে তাদের আরও ৯ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন দলের উপশহর শাখার সেক্রেটারি আব্দুল হাই সিদ্দিকী বুলবুল, রুকন পদমর্যাদার মোস্তফা জামান উজ্জ্বল, ছাত্রশিবিরের এমএম কলেজ শাখার নেতা কামরুল ইসলাম ও মো. হাবিবুল্লাহ। এছাড়া বেনাপোল পোর্ট থানা শিবিরের সভাপতি রেজওয়ান হোসেন গুম হয়েছেন।
জেলা জামায়াতের সহকারী সম্পাদক অধ্যাপক গোলাম কুদ্দুস জানান, এমএম কলেজের আসাদ হলে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা শিবিরের দুই নেতাকে প্রকাশ্যে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। সেই পৈশাচিক ঘটনায় জড়িতরা আজও বহালতবিয়তে রয়েছে। চৌগাছার দুই ছাত্রশিবির নেতাকে ধরে নিয়ে পুলিশ গুলি চালিয়ে একটি করে পা অকেজো করেছে। যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু জানান, “বিশেষ করে ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে তাদের আর ভোটের দরকার ছিল না।
তাই বিরোধীদের ওপর যত ধরনের নিপীড়ন-নির্যাতন সম্ভব, সবই করা হয়েছে। মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর ধর্মবিদ্বেষী বক্তব্যের প্রতিবাদে প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচিতেও পুলিশ বিনাউসকানিতে হামলা চালিয়ে অন্তত ৪৫ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতকিছুর পরও আমাদের নেতাকর্মীরা কক্ষচ্যুত হয়নি। হাসিনার পতন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে গেছে।” জেলা জামায়াতে ইসলামের আমির অধ্যাপক গোলাম রসুল বলেন, “যশোরের গডফাদাররা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে আমাদের নেতাকর্মীদের হত্যা, গুম, পঙ্গু করেছে।

পুলিশ আর আওয়ামী ক্যাডাররা মিলে অসংখ্য বাড়ি-ঘরে আগুন দিয়েছে।” আওয়ামী দুঃশাসনের প্রায় গোটা সময় জামায়াতে ইসলামীর জেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত সব কার্যালয় পুলিশ ও শাসক দলের পাণ্ডারা বন্ধ করেছিল। নেতারা গোপনে বিভিন্ন স্থানে মিলিত হয়ে দলীয় কার্যক্রম চালাতেন। খবর পেলে পুলিশ হানা দিয়ে ‘নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগ’ এনে নেতাদের আটক করত ও মামলা দিত। বিএনপির কোনো কার্যালয় বন্ধ হয়নি বলে দাবি করেন দলটির নেতারা। অফিস খোলা থাকলেও স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে গেলে পুলিশ হানা দিত, সরকারি দলের পাণ্ডারা হামলা করত। তবে দল দুটির বহু নেতাকর্মীর ব্যবসা, জমি, মাছের ঘের ও ফলের বাগান দখল করে নিয়েছিল আওয়ামী ক্যাডাররা।
৫ আগস্টের পর এসব সম্পদ পুনরুদ্ধার হচ্ছে। কোথাও কোথাও সম্পদ পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে বিশেষত বিএনপি নেতাকর্মীরা দলীয় শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছেন। বিএনপি ও জামায়াত নেতারা জানান, দলীয়ভাবেই হয়রানিমূলক এসব মামলা মোকাবিলা করা হয়েছে। তুলনামূলক ছোট দল বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদও যশোরের নাগরিকদের কাছে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তিনি ও তার কর্মীরা ভবদহ আন্দোলন ও রোডমার্চ করতে গিয়ে একাধিকবার আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন।
জাহিদ জানান, আওয়ামী ক্যাডার ও পুলিশের ষড়যন্ত্রের কারণে তাকে হত্যা করা হয়। দুর্বৃত্তদের অন্তর্কলহের কারণে তিনি রেহাই পান। আওয়ামী শাসনামলে যশোরে নির্বাচন বা বিএনপির কোনো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি থাকলে তার আগের রাতে নেতাদের বাড়ি ও পার্টি অফিসে বোমা হামলা হতো। অভিযোগ আছে, আওয়ামী লীগের গুণ্ডাবাহিনীর সঙ্গে এসব হামলায় অংশ নিতেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অতিউৎসাহী সদস্যও। দলের স্থায়ী কমিটির তৎকালীন সদস্য তরিকুল ইসলাম, তার ছেলে কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জেলা কমিটির বর্তমান সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন, সাবেক মেয়র মারুফুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক মুনির আহমেদ সিদ্দিকী বাচ্চু, গুরুত্বপূর্ণ নেতা মিজানুর রহমান খান, গোলাম রেজা দুলু, হাজি আনিছুর রহমান মুকুলের বাড়ি ছাড়াও শহরের প্রধান নেতাদের বাসভবনে বহুবার বোমা হামলা হয়েছে।
ওই ঘটনাগুলোর কোনোটি মামলায় রূপ নেয়নি। দুর্বৃত্তরা ধরা পড়েননি, যদিও সবাই জানে কে এ হামলা চালিয়েছে। দলের নেতারা বলেন, কয়েকবার থানায় অভিযোগ দেওয়া হলেও পুলিশ মামলা হিসেবে রেকর্ড করেনি। ফ্যাসিবাদী জমানায় এসব অপরাধের বিচারের আশা করেননি। আওয়ামী শাসনামলে জামায়াতের যশোর জেলা কার্যালয় ছাড়াও উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কয়েকটি কার্যালয়েও বোমা হামলা হয়েছে। অফিসের কক্ষ তছনছ করেছে পুলিশ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকারি হিসাবে যশোরে শহীদের সংখ্যা ২৭। স্বাস্থ্য সেলের সক্রিয় কর্মী ও নিহত পরিবারগুলোর সেবায় নিবেদিত মেজবাউর রহমান রামিমও এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। শহীদদের মধ্যে তিনজন রাজধানীতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন।
অন্যরা যশোরের গডফাদার শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন ফাইভ স্টার হোটেলে দেওয়া আগুনে মারা যান। শহীদদের মধ্যে ইমতিয়াজ আহমেদ জাবির, তৌহিদুর রহমান রানা, সাকিবুল হাসান মাহি, তানভীর রায়হান আলিফ, ইউসুফ আলী, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, মো. আল-আমিন হোসেন ও ফরহাদ ফাইয়াজকে বিএনপি তাদের কর্মী বলে দাবি করে। তবে মোহাম্মদ আব্দুল্লাহকে শিবিরের নেতা হিসেবে দাবি করে জামায়াতে ইসলামী।
বিএনপির কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, “বিরুদ্ধ মত দমনের কৌশলের অংশ হিসেবে হাসিনার ক্যাডার ও প্রশাসনের অতিউৎসাহী সদস্যরা আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন-নিপীড়ন করেছে। জনপ্রিয় নেতাদের ওপর টার্গেট কিলিং করা হয়েছে। বেনাপোলে একটি বাসাবাড়ির তিন তলার ছাদে মিলাদে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের নিচে ছুড়ে ফেলে যুবলীগের চিহ্নিত ক্যাডাররা। ওই ঘটনায় আহত স্থানীয় নেতা আব্দুল আলিম ২৮ দিন চিকিৎসার পর মারা যান। আহতরা এখনো পুরোপুরি সুস্থ নন।”
জামায়াতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আজীজুর রহমান বলেন, “সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট রেজিম ছিল অত্যাচারী শাসকের আমল। সারা দেশের মতো যশোরেও ওই সময়কালে আইন, নিয়ম-নীতির বালাই ছিল না। পুলিশ কত নৃশংস হতে পারে এসপি আনিসুর রহমানের সময় থেকেই আমরা দেখেছি। তারই ধারাবাহিকতা পরবর্তী সময়ে চলেছে।”
বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, “ওই সাড়ে ১৫ বছর রাষ্ট্র ও সমাজের কর্তৃত্বে ছিল দুর্বৃত্তরা। মানুষের জীবন হয়ে উঠেছিল অসহনীয়, উৎকণ্ঠায় ভরা। গ্রামের কোনো হাট-বাজারে সভা করতে গেলেও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা কৈফিয়ত তলব করত। তারা অর্থ উপার্জনের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য দখল ও রাজনৈতিক কারণে মেতে উঠেছিল।”

