নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে মূল্যস্ফীতির চাপ কীভাবে প্রতিদিনের বাস্তবতাকে বদলে দিচ্ছে—তার একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় পটুয়াখালীর মহিপুরের জেলে রফিক মাঝির গল্পে। সারা দিন সাগরে জাল ফেলে তার আয় হয় গড়ে ৫০০ টাকার মতো। কয়েক বছর ধরে এই আয় প্রায় একই থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে দ্রুতগতিতে। বিশেষ করে করোনা মহামারির পর চাল-ডালের দাম বাড়তে শুরু করলে তাকে বাধ্য হয়ে খাবারের তালিকা কমাতে হয়।
৫২ বছর বয়সী রফিকের পরিবারে এখন আর আগের মতো মাছ বা ডিম নিয়মিত ওঠে না। সময়ের সঙ্গে তার সংসারের অভাব কমেনি, বরং বেড়েছে। সাগরে মাছ না পাওয়া বা মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা থাকলে ধারদেনা করেই সংসার চালাতে হয় তাকে। তার প্রতিদিনের লড়াই এখন তিন বেলার খাবার জোগাড় করা, যেখানে বেশির ভাগ দিনই খাবার বলতে থাকে শুধু ভাত আর সবজি।
সম্প্রতি জ্বালানি তেলের সংকটে অনেক জেলের মতো রফিকও নিয়মিত সাগরে যেতে পারেননি। সামনে আবার শুরু হচ্ছে মাছ ধরার নতুন নিষেধাজ্ঞা। এই সময় সংসার কীভাবে চলবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে তার। তিনি বলেন, সবকিছুর দাম বাড়লেও তাদের আয় বাড়েনি।
রফিক একা নন; দেশের কোটি কোটি নিম্ন আয়ের মানুষ একই চাপে আছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, সেই তুলনায় আয় বাড়ছে না। ফলে প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, টানা চার বছর ধরে দেশের মানুষের প্রকৃত আয় নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে।
মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তের কর্মচারী কবির হোসেনও একই বাস্তবতার মুখোমুখি। তার ভাষায়, দৈনন্দিন চাহিদা পূরণই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। সন্তানেরা ভালো খাবারের দাবি জানালেও তা পূরণ করতে পারেন না তিনি। উল্টো প্রতি মাসেই ধার করতে হচ্ছে। সামনে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় কীভাবে কাটবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা আরও বাড়ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মজুরি কিছুটা বাড়লেও তা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। গত মার্চ পর্যন্ত টানা ৫০ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। সর্বশেষ হিসাবে মার্চে মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ, যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ, মজুরি বৃদ্ধির হার ০ দশমিক ৬২ পারসেন্টেজ পয়েন্ট পিছিয়ে ছিল।
একই চিত্র দেখা যায় লালমনিরহাটের খেতমজুর প্রশান্ত কুমার রায়ের জীবনেও। ৪৫ বছর বয়সী এই কৃষিশ্রমিক আগে মৌসুমে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করলেও এখন ১৪ হাজার টাকাও আয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কৃষি উপকরণের দাম বাড়ায় তার আয় কমে গেছে।
সংসারের খরচ সামাল দিতে সঞ্চয় ভেঙেছেন প্রশান্ত। পুষ্টিকর খাবার কেনা প্রায় বন্ধ। হঠাৎ অসুস্থতা বা জরুরি প্রয়োজনে ঋণ নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না, ফলে ঋণের বোঝা বাড়ছেই।
রফিক ও প্রশান্তের মতো অধিকাংশ মানুষই দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মজীবী ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের প্রায় ৮৪ শতাংশ এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। এদের একটি বড় অংশ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বা ইতিমধ্যে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, পুষ্টিকর খাবার থেকে সরে গিয়ে শুধু ন্যূনতম ক্যালরির ওপর নির্ভর করা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বলেন, অপুষ্টিতে ভোগা শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা কমে যায় এবং শারীরিক সক্ষমতা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা মানসিক ও মেধা বিকাশে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
তিনি আরও বলেন, শ্রমবাজারে নতুন মানুষের প্রবেশ বাড়লেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই হারে বাড়ছে না। নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় শ্রমিকের চাহিদা কমেছে, যা মজুরির ওপর চাপ তৈরি করছে। পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন ধীরগতির হওয়ায় সাধারণ শ্রমিকদের আয়ের একটি বড় উৎস সংকুচিত হয়েছে।
সরকারের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে মানুষের প্রকৃত আয়ের ওপর চাপ আরও বাড়বে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও যাতায়াত খরচ বেড়ে গেলে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আয় না বাড়লেও পরিবারের ব্যয় বাড়ছে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছে, যাদের আয়ের বড় অংশই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই ব্যয় হয়।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমতে পারে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে অতিরিক্ত প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে থেকে যেতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর আগে ধারণা করা হয়েছিল, প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসবে। এখন সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দিনে ৩ ডলার আয়ের হিসাবে আরও প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হতে পারে।

