বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) গৌরবময় ৪৫ বছর পূর্ণ করে আজ ১৫ এপ্রিল (বুধবার) ৪৬তম বছরে পদার্পণ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও পরিকল্পিত শিল্পায়নের লক্ষ্য সামনে রেখে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্দেশ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে ১৯৮০ সালে ‘বেপজা আইন’ প্রণয়ন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮১ সালের ১৫ এপ্রিল গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে বেপজার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রাম ইপিজেড থেকে প্রথম পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে দেশে রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এরপর এই সফল মডেল ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বিস্তৃত হয়।
১৯৯৩ সালে ঢাকা ইপিজেড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজধানীর কাছাকাছি শিল্পায়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হয়। একই সময়ে অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান আদমজী জুট মিল এবং চট্টগ্রাম স্টিল মিলকে ইপিজেডে রূপান্তরের মতো কৌশলগত উদ্যোগ শিল্পখাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। বর্তমানে বেপজা দেশের আটটি ইপিজেড—চট্টগ্রাম, ঢাকা, মোংলা, কুমিল্লা, উত্তরা, ঈশ্বরদী, আদমজী ও কর্ণফুলী—এবং চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিচালনা করছে। পাশাপাশি যশোর ও পটুয়াখালী ইপিজেড স্থাপনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।
স্বল্প জমি ব্যবহার করেও উচ্চ অর্থনৈতিক ফলাফল অর্জনে বেপজা একটি কার্যকর উদাহরণ তৈরি করেছে। সংস্থাটির অধীন মোট জমির পরিমাণ মাত্র ৩,৫৫০ একর, যা দেশের মোট ভূখণ্ডের ০.০০১ শতাংশেরও কম। তবুও এই সীমিত পরিসর থেকেই দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ আসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানিতে বেপজার অবদান দাঁড়ায় ১৭.০৩ শতাংশ। গত ৪৫ বছরে সংস্থাটি ৭.২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে এবং ১২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি সম্ভব করেছে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বেপজা বড় ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে ইপিজেডগুলোতে প্রায় ৫.৫ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক কাজ করছেন, যাদের একটি বড় অংশ নারী। এই কর্মসংস্থান শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নেই নয়, সামাজিক উন্নয়ন ও নারী ক্ষমতায়নেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যেও বেপজা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। আগে যেখানে প্রধানত তৈরি পোশাক খাতের আধিপত্য ছিল, এখন ইপিজেডগুলোতে উৎপাদিত হচ্ছে গাড়ির যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক উপকরণ, ক্যামেরা লেন্স, বাইসাইকেল, জুতা, চশমার ফ্রেমসহ উচ্চমূল্যের নানা পণ্য। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড আরও বিস্তৃত পরিচিতি পাচ্ছে।
পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নেও বেপজা অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। ইপিজেডগুলোতে বর্তমানে ২৭টি লিড সার্টিফায়েড সবুজ কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে ৮টি প্লাটিনাম মানের। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানি ব্যবস্থাপনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে টেকসই শিল্পায়নের একটি কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ইপিজেডগুলোতে প্রায় ৩২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২৫ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজ করতে বেপজা দীর্ঘদিন ধরে ‘One Window Service’ পদ্ধতি অনুসরণ করছে। দ্রুত সেবা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রতিষ্ঠানটি একটি আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
শ্রমিক কল্যাণেও বেপজা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ইপিজেড এলাকায় হাসপাতাল, ডে-কেয়ার সেন্টার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জন্য সামাজিক সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শ্রমিক অধিকার সুরক্ষায় নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে।
একটি পরিকল্পিত উদ্যোগ থেকে শুরু হয়ে আজ বেপজা বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের একটি সফল মডেলে পরিণত হয়েছে। ৪৬তম বছরে পদার্পণের এই সময়ে সংস্থাটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে আরও এগিয়ে যাচ্ছে।

