মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ইরান আবারও তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়ে দিয়েছেন—বাইরের চাপ বা সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে কখনোই আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না।
বুধবার তেহরানে জরুরি সেবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এই মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যে ছিল দৃঢ়তা, তবে একই সঙ্গে ছিল কূটনৈতিক বার্তাও। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরান কোনোভাবেই যুদ্ধ চায় না, বরং সবসময়ই পারস্পরিক সম্মান ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে আগ্রহী।
পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি একদিকে যেমন আত্মসমর্পণের সম্ভাবনাকে সরাসরি নাকচ করেছেন, অন্যদিকে সম্পূর্ণভাবে সংলাপের পথও বন্ধ করেননি। এটি ইঙ্গিত দেয়, তেহরান এখন ‘চাপের কাছে নতি স্বীকার নয়, কিন্তু আলোচনায় আগ্রহী’—এই দুই অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে চাইছে।
এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপ শুরু হওয়ার গুঞ্জন চলছে। পাকিস্তানে দ্বিতীয় দফার বৈঠক আয়োজনের সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে। যদিও ইরানের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করা হয়নি, তবুও কূটনৈতিক যোগাযোগ যে একেবারে থেমে নেই—তা পরিষ্কার।
এর আগে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার বৈঠক কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। দুই পক্ষই এই ব্যর্থতার জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে। ফলে অবিশ্বাসের একটি বড় দেয়াল এখনো রয়ে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে পেজেশকিয়ানের বক্তব্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, এটি শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বার্তা নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একটি পরিষ্কার সংকেত—ইরান নিজেদের অবস্থান থেকে সহজে সরে আসবে না।
বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১৪ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি চলছে, যা শুরু হয় ৮ এপ্রিল এবং শেষ হওয়ার কথা ২২ এপ্রিল। এই সময়টিই মূলত কূটনৈতিক অগ্রগতির জন্য একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো, এই যুদ্ধবিরতি যতটা না শান্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে, তার চেয়ে বেশি তৈরি করছে অনিশ্চয়তা। একদিকে সম্ভাব্য আলোচনার প্রস্তুতি, অন্যদিকে মাঠে উত্তেজনা—এই দ্বৈত পরিস্থিতিই এখন পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে।
পেজেশকিয়ানের বক্তব্য মূলত একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে আনে—বর্তমান সংঘাতে শুধু সামরিক শক্তি নয়, কূটনৈতিক কৌশলও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপের মুখেও ইরান নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে, আবার একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমর্থনও হারাতে চাইছে না।
এই পরিস্থিতি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরান এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে তারা একদিকে শক্ত অবস্থান দেখাতে বাধ্য, অন্যদিকে পুরোপুরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও নিতে চায় না।
তাই “আত্মসমর্পণ নয়, কিন্তু সংলাপের পথ খোলা”—এই নীতিই আপাতত তেহরানের মূল কৌশল বলে মনে হচ্ছে। আর এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে আসন্ন দিনগুলোর কূটনৈতিক অগ্রগতির ওপর।

