কোনো উদ্যোগেই থামছে না দেশের জ্বালানি খাতের অস্থিরতা। পেট্রোল ও অকটেন নিতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি এখনো নিয়মিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে। সরকার রেশনিং, ট্যাগ অফিসার নিয়োগ, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান এবং ‘ফুয়েল পাস’সহ একাধিক পদক্ষেপ নিলেও পরিস্থিতিতে বড় কোনো উন্নতি দেখা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, চাহিদার অতিরিক্ত চাপ এবং কিছু ক্ষেত্রে মজুতদারির প্রবণতা—এই তিনটি কারণ মিলেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সরকার স্বল্পমেয়াদি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার—দুই ধরনের উদ্যোগ একসঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছে।
সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ:
সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলোর একটি হলো ‘ফুয়েল পাস’ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা। এই ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি বরাদ্দ থাকবে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পুরো বিতরণ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হবে। এতে অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ, পুনরায় বিক্রি বা মজুতের সুযোগ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু কারিগরি সমস্যার কারণে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধা তৈরি হয়েছে। তবুও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় এটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাশাপাশি পেট্রোল পাম্পে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা এই দায়িত্ব পালন করছেন। তারা পাম্পে জ্বালানি বিক্রি, মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন। এতে অনিয়ম, অতিরিক্ত বিক্রি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রবণতা কমানোর চেষ্টা চলছে।
বিপিসির পরিচালক (বিপণন) ও সরকারের যুগ্ম সচিব মো. সাবেত আলী বলেন, “জ্বালানি তেলের এ সমস্যা শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী। তারপরও আমরা সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রেখেছি। গত বছর এই সময়ে যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের সরবরাহ ছিল এখনো একই রয়েছে। অনেকে প্যানিক বায়িং করছেন। আর অবৈধ তেল মজুতদারদের বিরুদ্ধে সরকারের অভিযান চলমান।”
জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করতে সরকার ডিজিটালাইজেশনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রতিটি লেনদেন ডিজিটালভাবে রেকর্ড করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কোন যানবাহন কত জ্বালানি নিচ্ছে তা সহজে ট্র্যাক করা সম্ভব হবে। এতে কেন্দ্রীয়ভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য আনা সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে মজুতদারি ও কালোবাজারির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অভিযান জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে অবৈধ জ্বালানি মজুত ও বিক্রির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সীমান্ত এলাকা ও ডিপোগুলোতে নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে, যাতে পাচার বা অবৈধ লেনদেন রোধ করা যায়।
সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। ডিপো থেকে জ্বালানি উত্তোলন ও পরিবহনের সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে, যাতে দ্রুত পাম্পে জ্বালানি পৌঁছায়। বিভিন্ন এলাকার চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ সমন্বয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে কিছু এলাকায় অতিরিক্ত সংকট তৈরি হওয়া কমছে বলে জানা গেছে।
অস্থির পরিস্থিতিতে সরকার কিছু সময়ের জন্য সীমিত পরিমাণে জ্বালানি বিক্রির নির্দেশও দিয়েছিল। মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করায় তুলনামূলক বেশি গ্রাহকের কাছে জ্বালানি পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা সাময়িকভাবে চাপ কমাতে ভূমিকা রেখেছে।
জ্বালানি সাশ্রয় ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা:
জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারি দপ্তরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সংযম আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সাশ্রয়ী ব্যবহারের আহ্বান জানানো হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা আনতে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার, বাজার ব্যবস্থার সংস্কার এবং নীতিগত পরিবর্তনের ওপর কাজ চলছে। তবে এত উদ্যোগের পরও ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি পুরোপুরি কমেনি।

