উত্তরবঙ্গকে ঘিরে দীর্ঘদিনের কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছে স্কয়ার ফুড। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এ অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও সঠিক অবকাঠামো ও নীতিগত সহায়তার অভাবে অনেক সুযোগ এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
স্কয়ার ফুড জানায়, তারা গত প্রায় ২৫ বছর ধরে উত্তরবঙ্গে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। পাবনায় তাদের আধুনিক খাদ্যপণ্যের কারখানা রয়েছে। পাশাপাশি দিনাজপুরে চালকল পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে তাদের কাঁচামালের প্রায় ৮০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে উত্তরাঞ্চলে কৃষিনির্ভর শিল্পে কার্যক্রম চালিয়ে আসার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে আরও বিনিয়োগের পরিকল্পনাও করছে।
তবে এই অঞ্চলে কৃষিপণ্যের বড় একটি অংশ সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করে স্কয়ার ফুড। প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় ফসল তোলার পর উত্তরাঞ্চলে উৎপাদিত ফল ও খাদ্যপণ্যের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। তারা মনে করে, পর্যাপ্ত কোল্ডস্টোরেজ বা হিমাগার সুবিধা তৈরি করা গেলে কৃষকরা সরাসরি লাভবান হবেন এবং কৃষিভিত্তিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাও আরও সম্প্রসারিত হবে।
স্কয়ার ফুডের মতে, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো ফল ও কৃষিপণ্য রপ্তানির মাধ্যমে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের সুযোগ রয়েছে, যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও রপ্তানি অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়।
সরকার সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণে আগ্রহী বলেও জানায় প্রতিষ্ঠানটি। তাদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। স্কয়ার ফুড মনে করে, দেশে সূর্যমুখীর বাণিজ্যিক চাষের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে সূর্যমুখী তেলের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু বাজারের বড় অংশই এখনো আমদানিনির্ভর। এতে দাম তুলনামূলকভাবে বেশি থাকছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন দাম কমবে, অন্যদিকে ডলার সাশ্রয়ও সম্ভব হবে। এই খাতে সরকারি নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা পেলে স্কয়ার ফুড বিনিয়োগে আগ্রহী বলেও জানায়।
অন্যদিকে, চিনিগুঁড়া চাল রপ্তানির বিষয়েও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের মতে, বাংলাদেশের চিনিগুঁড়া চালের আন্তর্জাতিক বাজারে বড় চাহিদা রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী নীতিমালা না থাকায় রপ্তানির ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে সময়ে সময়ে বিশেষ আদেশের মাধ্যমে রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়। তাই এ বিষয়ে স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে স্কয়ার ফুড।
রপ্তানি খাতে আরেকটি বড় বাধা হিসেবে রেডিয়েশন বা বিকিরণ সেবার সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করা হয়। স্কয়ার ফুড জানায়, সাভারের রেডিয়েশন সেন্টারের সীমিত সক্ষমতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ গুরুত্বপূর্ণ বাজারে মসলা জাতীয় পণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনা ব্যাহত হচ্ছে।
উত্তরবঙ্গে শিল্প সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে গ্যাস সংকটকেও বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের পরিকল্পনায় থাকা ফলভিত্তিক কোমল পানীয় কারখানা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না এই গ্যাস সমস্যার কারণে। এ বিষয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে বলে জানায় স্কয়ার ফুড।
সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন হলো, উত্তরবঙ্গে কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে খুব বেশি বাধা থাকার কথা নয়। ইতোমধ্যে বড় বড় প্রতিষ্ঠান এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী। তবে প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা, বিদ্যমান সমস্যার সমাধান এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। এতে কৃষকরা উপকৃত হবেন, উৎপাদন বাড়বে এবং কৃষিনির্ভর অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
- মো. পারভেজ সাইফুল ইসলাম, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ

