দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, সিএমএসএমই খাতের বিকাশ মানেই সামগ্রিক অর্থনীতির অগ্রগতি। তাই সরকার ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে এবং এর জন্য একটি একীভূত অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
গতকাল বুধবার বিকেলে রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাতের সমন্বয়: ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. তিতুমীর আরও বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ আর্থিক খাতের বিদ্যমান আইনগুলোতে সংস্কার আনা ছাড়া বিকল্প নেই। শ্রমঘন শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানো সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি জানান, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তায় সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
জ্বালানি খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বৈশ্বিক সংকটের প্রভাবে মানুষের জীবনযাত্রায় অতিরিক্ত চাপ যাতে না পড়ে, সে লক্ষ্যেই জ্বালানি তেলের দাম এখনো বাড়ানো হয়নি। আর্থিক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, এ খাতে কিছু দুর্বলতা রয়েছে, যা সরকার নীতি সংস্কার ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগের মাধ্যমে সমাধান করবে। দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ঋণব্যবস্থা গড়ে তুলতে শক্তিশালী বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজারের বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের অভাবে দেশের শিল্প খাতে উৎপাদন কমে গেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে বকেয়া ও খেলাপি ঋণ। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় এবং সরকারি ঋণ বাড়ায় শিল্প খাত চাপের মুখে পড়েছে। এ অবস্থার উত্তরণে ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কার, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বাড়ানোর ওপর তিনি জোর দেন।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, এসএমই খাতে অর্থায়ন সহজ করা এখন সময়ের দাবি। বেসরকারি ব্যাংকগুলো এ খাতে এগিয়ে এলেও নীতিনির্ধারকসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে, যা দ্রুত দূর করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগ) নওশাদ মোস্তফা বলেন, আর্থিক খাতে প্রকৃত তথ্যের অভাব রয়েছে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা তৈরি করছে। এ সমস্যা সমাধানে সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভর, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক (গবেষণা) সেলিম আল মামুন জানান, বাজারে তারল্য থাকলেও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবে বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না। ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন এবং মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের মধ্যে রাখার চেষ্টা চলছে বলেও উল্লেখ করেন।
এনসিসি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. শামসুল আরেফিন বলেন, ব্যাংকগুলো এখন পরিবেশবান্ধব গ্রিন প্রকল্পে অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে এসএমই উদ্যোক্তাদের তথ্য সংরক্ষণের দুর্বলতা ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সিটি ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আশানুর রহমান জানান, আগামী বছর থেকে আইএফআরএস বাস্তবায়নের ফলে ব্যাংক খাতে প্রভিশনিং কাঠামোতে পরিবর্তন আসবে। এতে ব্যাংকের সক্ষমতা কিছুটা কমতে পারে এবং খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তিনি এসএমই খাতে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি তথ্যপ্রবাহ সহজ করার ওপর জোর দেন।
তিনি আরও বলেন, এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য একটি কার্যকর মার্কেটপ্লেস গড়ে তোলা জরুরি। এটি না হলে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা কঠিন হবে এবং ব্যাংকগুলোর ঋণ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হবে।

