বাংলাদেশি শ্রমবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মালয়েশিয়ার কর্মসংস্থান খাত আবারও জুলাইয়ের মধ্যে উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এর আগে বাংলাদেশকে বেশ কিছু কঠোর শর্ত পূরণ করতে হবে বলে জানা গেছে। এই শর্তগুলোকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় এসেছে আগের বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়া ও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের প্রসঙ্গ, যাদের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে এই শ্রমবাজারের উন্মুক্ত ও বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রায় দুই দশক ধরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও নাটকীয় পরিস্থিতি চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। একাধিকবার বাজার খুললেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা আবার বন্ধ হয়ে যায়। এর পেছনে সিন্ডিকেট প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ বহুদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। ফলে এই শ্রমবাজারটি নিয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রত্যাশা বারবার ভেঙে পড়েছে।
মালয়েশিয়া সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির একটি অংশের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিষয়টি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, প্রতারণা এবং অর্থ পাচারের মতো অভিযোগে একাধিক মামলার কথাও আলোচনায় রয়েছে। এসব পরিস্থিতির কারণে মালয়েশিয়ার শ্রম ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর পর্যবেক্ষণের মুখে পড়েছে বলে জানা যায়।
সম্প্রতি কুয়ালালামপুরে দুই দেশের মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। সেখানে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে কিছু চলমান মামলার নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে সূত্র জানায়। এসব মামলা নিষ্পত্তি না হলে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদ্যমান আইন অনুযায়ীই এসব মামলার নিষ্পত্তি করা হবে।
বৈঠকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে—বিশ্বস্ত ও যোগ্য এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী প্রেরণ। তবে এই প্রক্রিয়াটি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ এতে নির্দিষ্ট কিছু এজেন্সিকে প্রাধান্য দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ মনে করছেন। একই সঙ্গে ‘শূন্য অভিবাসন ব্যয়’-এ কর্মী পাঠানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে। অতীতে এই ধরনের ঘোষণা থাকলেও কর্মীদের উচ্চ ব্যয় বহন করতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জনশক্তি রপ্তানিকারক সংস্থা বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, যৌথ বিবৃতিতে ‘শূন্য খরচে’ কর্মী পাঠানোর যে কথা বলা হয়েছে, তা নতুন করে সিন্ডিকেট তৈরির কৌশল হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তিনি অতীতের উদাহরণ টেনে বলেন, ২০১২ সালের জিটুজি পদ্ধতি এবং ২০২২ সালের উদ্যোগেও একই ধরনের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে কর্মীদের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। তার মতে, এবারও বিনা খরচের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে অতিরিক্ত ব্যয় বহনের আশঙ্কা থেকে যায়।
তিনি আরও বলেন, যৌথ বিবৃতিতে ‘ক্রেডিবল’ ও ‘কোয়ালিফাইড’ এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, যা অন্যান্য শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায় না। তার প্রশ্ন, এসব এজেন্সি কারা নির্ধারণ করবে এবং কোন মানদণ্ডে নির্বাচন করা হবে। অতীতে এমন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সীমিত কিছু পক্ষ সুবিধা নিয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। মালয়েশিয়া প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) একটি নিয়োগ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে। এর লক্ষ্য মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো, অভিবাসন ব্যয় হ্রাস করা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করা। একই সঙ্গে নিয়োগের ব্যয় নিয়োগকর্তাদের বহন করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগের সমঝোতা স্মারকের কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে আবারও পুরোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। কারণ পূর্বের চুক্তিতে যোগ্য এজেন্সি নির্বাচনের ক্ষমতা নির্দিষ্ট পক্ষের হাতে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে নতুন ব্যবস্থাতেও সেই বিতর্ক ফিরে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার শিগগিরই বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। তিনি জানান, ‘ক্রেডিবল’ এজেন্সি নির্বাচন কোনো নতুন সিন্ডিকেট তৈরির উদ্যোগ নয়। বরং এটি সব দেশের জন্য একই মানদণ্ডে প্রযোজ্য একটি প্রক্রিয়া হবে। তার মতে, সরকারের লক্ষ্য হলো বেশি সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সিন্ডিকেট ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া।
মামলাসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি আরও বলেন, যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে এবং দেশে বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করছে। অপরাধে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, আর নির্দোষরা ন্যায়বিচার পাবেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে। ওই বছর মালয়েশিয়া সরকার জানায়, পূর্বে অনুমোদন পাওয়া কর্মীদের ৩১ মের মধ্যে দেশটিতে প্রবেশের সুযোগ থাকবে। তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ফ্লাইট জটিলতার কারণে প্রায় ১৭ হাজার কর্মী এখনো সেখানে যেতে পারেননি।

