দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও গাজীপুরের ধীরাশ্রম ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) প্রকল্প এখনো বাস্তবায়নের ধীরগতিতে আটকে আছে। দীর্ঘসূত্রতার এই চক্রে রাজধানীর কমলাপুর আইসিডির ওপর চাপ বেড়েই চলেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায়। বাড়ছে ভোগান্তি, কমছে রেলপথে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ।
১৯৮৭ সালে চালু হওয়া কমলাপুর আইসিডি দীর্ঘদিন দেশের একমাত্র কার্যকর ডিপো হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রয়োজনীয় উন্নয়ন না হওয়ায় এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে রেলভিত্তিক পরিবহন থেকে সরে যাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতি বছর কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাড়লেও সেই তুলনায় রেলপথে পরিবহন কমছে। একসময় মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ১০ শতাংশ রেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো। এখন তা নেমে এসেছে ৪ শতাংশেরও নিচে। সাশ্রয়ী ও তুলনামূলক নিরাপদ হওয়া সত্ত্বেও রেলপথে আগ্রহ কমে যাওয়ার পেছনে অনিশ্চয়তা বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রচলিত ব্যবস্থায়, চট্টগ্রাম বন্দরসংলগ্ন সিজিপিওয়াই ইয়ার্ড থেকে কনটেইনারবাহী ট্রেন ঢাকার কমলাপুর আইসিডিতে আসে। এখান থেকে রফতানি পণ্য ও খালি কনটেইনার আবার বন্দরে ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু ইঞ্জিন সংকটের কারণে এই পরিবহন ব্যবস্থা নিয়মিত ব্যাহত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক জানিয়েছেন, চাহিদা থাকলেও পর্যাপ্ত পণ্যবাহী ট্রেনের অভাবে কনটেইনার ঢাকায় পাঠানো যাচ্ছে না। এতে বন্দরে কনটেইনার জমে অপারেশনাল কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
রেলের তথ্য বলছে, কমলাপুর আইসিডির বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ৫০ হাজার কনটেইনার। অন্যদিকে ধীরাশ্রম আইসিডি চালু হলে এই সক্ষমতা বেড়ে ৪ লাখ ৩২ হাজার টিইইউএসে উন্নীত হওয়ার কথা। প্রকল্পের আওতায় ২৩০ দশমিক ৯৪ একর জমি অধিগ্রহণ এবং পূবাইল থেকে ধীরাশ্রম পর্যন্ত ৭ দশমিক ১৬ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ভিড়ে ধীরাশ্রম আইসিডির কাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। এর ফলে রাজধানীতে কনটেইনারবাহী যানবাহনের চাপও বাড়ছে, যা নগর ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রেলপথে পণ্য পরিবহনের অনিশ্চয়তা তাদের বিকল্প পথে যেতে বাধ্য করছে। এমএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন মিন্টু বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রেলওয়ে পণ্য পরিবহন সেবা ধরে রাখতে পারেনি। ফলে লোকসানের ঝুঁকি এড়াতে ব্যবসায়ীরা রেলপথ এড়িয়ে চলছেন।
রেলওয়ের তথ্যমতে, পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় ১৬টি ইঞ্জিন প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৩ থেকে ৫টি। এই সংকটের কারণে অনেক সময় কনটেইনার বোঝাই ট্রেনও স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানিয়েছেন, লোকোমোটিভ সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পরিবহন সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে পরিস্থিতি উন্নয়নে নতুন আইসিডি নির্মাণের পাশাপাশি শতাধিক লোকোমোটিভ আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

