দেশে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুত বিস্তার লাভ করলেও প্রযুক্তিগত অন্তর্ভুক্তি এখনো অসম ও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও দক্ষতা, নিরাপত্তা সচেতনতা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়নি—এমনই চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপে। ‘আইসিটি ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োগ পরিমাপ’ শীর্ষক এই জরিপে দেশের ডিজিটাল বাস্তবতার এক বৈষম্যমূলক চিত্র ফুটে উঠেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পরিসংখ্যান ভবনে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তবে এই ব্যবহারের বিস্তার সমান নয়। পুরুষদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ, আর নারীদের ক্ষেত্রে তা ৫০ দশমিক ২ শতাংশ। এই ব্যবধান ডিজিটাল ব্যবহারে লিঙ্গ বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়। জরিপে আরও বলা হয়েছে, উচ্চ ব্যয়ের কারণে ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার থেকে দূরে রয়েছে বা নিয়মিত ব্যবহার করে না।
শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যবধান এখানে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শহরাঞ্চলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও গ্রামে এই হার মাত্র ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ দুই অঞ্চলের মধ্যে পার্থক্য দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্টে, যা প্রযুক্তি ব্যবহারের অসম অগ্রগতিকে আরও প্রকট করেছে।
ডিভাইস প্রাপ্যতার সীমাবদ্ধতাও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে। গ্রামীণ এলাকায় মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারের কাছে কম্পিউটার রয়েছে। শহরে এই হার ২১ দশমিক ১ শতাংশ। ব্যক্তিগত ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বড় ফারাক দেখা যায়—গ্রামে মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ কম্পিউটার ব্যবহার করে, যেখানে শহরে তা ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
আঞ্চলিক চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকায় ইন্টারনেট ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে পঞ্চগড়ে এই ব্যবহার সবচেয়ে কম। কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ঢাকার পরিবারগুলো এগিয়ে, আর ঠাকুরগাঁও সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। এতে দেশের ভৌগোলিক ডিজিটাল বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরনেও মোবাইলের ওপর নির্ভরতা বেশি। দেশে ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। তবে নিজস্ব মোবাইল ফোন রয়েছে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষের। অন্যদিকে কম্পিউটার ব্যবহারকারীর হার মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। ফলে ডিজিটাল কার্যক্রম মূলত মোবাইলকেন্দ্রিকই রয়ে যাচ্ছে।
দক্ষতার দিক থেকেও বড় ঘাটতি দেখা গেছে। কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ কপি-পেস্ট করতে পারেন। অর্ধেকের কিছু বেশি ব্যবহারকারী ফাইল পাঠানো বা স্প্রেডশিট ফর্মুলা ব্যবহার করতে সক্ষম। অ্যাপ ইনস্টল করতে পারেন প্রায় ৪০ শতাংশ এবং প্রেজেন্টেশন সফটওয়্যার ব্যবহার করেন প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে ফাইল ট্রান্সফারের মতো তুলনামূলক জটিল কাজে দক্ষতা রয়েছে মাত্র প্রায় ১৫ শতাংশ ব্যবহারকারীর।
আরও গভীর ডিজিটাল দক্ষতার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ফাইল ট্রান্সফার, সফটওয়্যার সেটিংস পরিবর্তন বা জটিল ডিভাইস ব্যবস্থাপনার মতো কাজে সক্ষম মাত্র ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ প্রায় ৮৪ শতাংশ ব্যবহারকারী এখনো প্রযুক্তির উন্নত ব্যবহার থেকে পিছিয়ে রয়েছে।
নিরাপত্তা সচেতনতার ক্ষেত্রেও মিশ্র চিত্র পাওয়া গেছে। ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবহারকারী মনে করেন, সাইবার আক্রমণের ক্ষেত্রে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। তবে ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবহারকারীর কাছে ভাইরাস ও ম্যালওয়্যার এখনো বড় হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে।
ব্যবহারের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত তিন মাসে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ সরকারি চাকরি-সংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধান করেছে। ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ খেলাধুলা সম্পর্কিত তথ্য দেখেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও কনটেন্ট ব্যবহারের প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
তবে অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে কম। মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যবহারকারী অনলাইনে কেনাকাটা করেছে, যা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির সম্ভাবনার তুলনায় এখনও সীমিত অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়।
অনুষ্ঠানে জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন প্রকল্প পরিচালক সৈয়দা মারুফা শাকি। প্রধান অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিবিএসের মহাপরিচালক মো. ফরহাদ সিদ্দিকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

