১৪ এপ্রিল ২০২৬, পহেলা বৈশাখের দিনে টাঙ্গাইলে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। এ কর্মসূচি দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচির সূচনা করেন।
সরকারি ঘোষণায় বলা হয়, নির্বাচনের আগে দেওয়া পরিকল্পনাকে নীতিতে রূপান্তর করে বাস্তবায়নের ধারাবাহিক অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়; বরং কৃষকের সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি এখনো কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমশক্তি সরাসরি কৃষির সঙ্গে যুক্ত। গ্রামীণ পরিবারের বড় একটি অংশ এই খাতের আয়-উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল।
তবে কৃষকদের সামনে রয়েছে বহু ধরনের চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত বৃষ্টি, বন্যা, জলাবদ্ধতা, খরা, তাপদাহ এবং অনিয়মিত আবহাওয়া। পাশাপাশি জমির উর্বরতা হ্রাস, সেচের সীমাবদ্ধতা, কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, ন্যায্য দাম না পাওয়া, সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজার ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবও বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সামাজিক বাস্তবতায় কৃষিকাজকে এখনো অনেক ক্ষেত্রে নিম্ন মর্যাদার পেশা হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ কৃষিতে আগ্রহ হারাচ্ছে। এতে কৃষিতে প্রজন্মগত ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদন ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তবুও কৃষকরাই দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করে চলেছেন, যদিও তাদের অবদান দীর্ঘদিন ধরে নীতিগত ও সামাজিকভাবে যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি।
এ প্রেক্ষাপটে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে দেশের সব কৃষকের কাছে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে কৃষকরা ভর্তুকিযুক্ত কৃষি উপকরণ, সহজ শর্তে ঋণ, ফসল বীমা, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য বাজার সুবিধা এবং সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ ব্যবস্থায় অগ্রাধিকার পাবেন।
এ ছাড়া বাজার তথ্য সহজে পাওয়া, আধুনিক প্রযুক্তি ও সম্প্রসারণ সেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ এবং সরকারি ভর্তুকি ও সহায়তা সরাসরি পাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে বলে জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রশাসনিক জটিলতা ও তথ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। কর্মসূচির আওতায় শুধু ফসল উৎপাদনকারী কৃষকরাই নন, পোলট্রি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, ফুল ও ফল চাষসহ কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন খাতের সঙ্গে যুক্ত মানুষও সুবিধার আওতায় আসবে বলে জানানো হয়।
বাংলাদেশের কৃষি খাতে ঝুঁকির মাত্রাও উল্লেখযোগ্য। কৃষকরা নিয়মিতভাবে অতিরিক্ত রোদ, তাপদাহ, বন্যা, জলাবদ্ধতা, অতিবৃষ্টি এবং সাপ ও পোকামাকড়ের মতো ঝুঁকির মুখোমুখি হন। ফসল সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময়ও শারীরিক আঘাত ও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এসব ঝুঁকি আরও বেড়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে পানির গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে অনিয়মিত আবহাওয়া কৃষকদের শারীরিক সক্ষমতা ও কর্মক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলছে।
দেশে কৃষিতে নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে, বিশেষ করে বীজ সংরক্ষণ, ফসল প্রক্রিয়াজাত, শুকানো ও গৃহভিত্তিক কৃষি কার্যক্রমে। তবে দীর্ঘ সময় ঝুঁকে কাজ করা, ধুলাবালি ও রাসায়নিকের সংস্পর্শ এবং কীটনাশক ব্যবহারের মতো ঝুঁকি নারীদের স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কৃষি শ্রমিকরা বিশ্বে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ পেশাজীবী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত। শারীরিক আঘাত, কীটনাশকের সংস্পর্শ এবং পরিবেশগত ঝুঁকি তাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশে শ্রমনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার কারণে এই ঝুঁকি আরও বেশি প্রভাব ফেলছে।
কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে উৎপাদন ব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়ে। একজন কৃষক অসুস্থ হলে শুধু পারিবারিক আয়ই নয়, পুরো মৌসুমের উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে অনেক কৃষককে ঋণ নিতে হয় বা জমি বন্ধক রাখতে হয়। এতে পরবর্তী মৌসুমে কৃষি উপকরণে বিনিয়োগ কমে যায়। এর ফলে দারিদ্র্য আরও গভীর হয়। আয় কমে যাওয়া, ঋণের বোঝা এবং উৎপাদন হ্রাস—এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে অনেক কৃষক পরিবার অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে শিক্ষা, পুষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়নেও।
এ অবস্থায় ‘কৃষক কার্ড’ শুধু অর্থনৈতিক সুবিধার মাধ্যম নয়, বরং একটি সমন্বিত সুরক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টি সহায়তা এবং কীটনাশক ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সরকার একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে ব্যক্তিভিত্তিক স্বাস্থ্য তথ্য সংরক্ষণ এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষক কার্ডের সঙ্গে এই ব্যবস্থার সমন্বয় হলে কৃষকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান সহজ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনেও দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়া কৃষি উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলছে।
এই প্রেক্ষাপটে কৃষকদের সুরক্ষা শুধু একটি পেশাগত বিষয় নয়, বরং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ‘নতুন বাংলাদেশ’ ধারণাকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন দর্শন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে নাগরিকের অধিকার, সুযোগ ও মর্যাদা রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে বলে বলা হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কৃষক, শ্রমিক, নারী ও তরুণদের উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে সহায়ক ও সেবামূলক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই কাঠামোর অংশ হিসেবেই ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিকে একটি বাস্তব উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যা নীতি থেকে বাস্তবায়নের পথে একটি রূপান্তর নির্দেশ করে।
টাঙ্গাইল থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি পর্যায়ক্রমে সারা দেশে বিস্তৃত করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। এতে প্রতিটি কৃষকের কাছে সুরক্ষা ও সহায়তার সুযোগ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এই উদ্যোগকে কৃষি খাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের কৃষি ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে। শেষ পর্যন্ত কৃষকের উৎপাদন ও কল্যাণকে জাতীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

