ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা ছাড়ার কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করে, যা নিয়ে এখন ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী মহলের একাংশ এটিকে ‘অসম চুক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তাদের মতে, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের বাজার যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য আরও উন্মুক্ত হয়ে গেছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ রাজধানীতে এক সমাবেশে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তার দাবি, এর ফলে কর্মসংস্থান হ্রাসসহ বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। তিনি সংসদে আলোচনা করে চুক্তিটি প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানান এবং চুক্তি প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি তোলেন।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এক অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন, এই চুক্তির কিছু শর্ত জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধা তৈরি করতে পারে। তার মতে, এটি কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। জানা যায়, জাতীয় নির্বাচনের কয়েক দিন আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি এই বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সে সময় অন্তর্বর্তী সরকার জানায়, চুক্তির শর্ত ‘নন-ডিসক্লোজার’ থাকায় বিস্তারিত প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তির নথি প্রকাশ করা হয়।
চুক্তি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ কিছু পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কহার ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এর আড়ালে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে এমন বাণিজ্যচুক্তি করে যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী বলে বিবেচিত হয়, তবে ওয়াশিংটন চুক্তি বাতিল করতে পারবে এবং সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পণ্যে আবারও উচ্চ শুল্ক আরোপের সুযোগ থাকবে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশকে ‘নন-মার্কেট কান্ট্রি’ হিসেবে বিবেচনা করে না, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু ধরনের বাণিজ্যচুক্তি করার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা আরোপের বিষয়টি চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। পারমাণবিক জ্বালানি ও সংশ্লিষ্ট উপাদান কেনার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দিয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশ পেয়েছে ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে শুল্কছাড় সুবিধা। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৫০০টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে, যার মধ্যে বিভিন্ন শিল্পপণ্য, কৃষিপণ্য, যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক উপকরণ রয়েছে।
এছাড়া ১ হাজার ৫৩৯টি পণ্যের শুল্ক ধাপে ধাপে কমিয়ে পাঁচ বছরের মধ্যে শূন্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। আরও ৬৭২টি পণ্যের ক্ষেত্রে ১০ বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে শুল্ক সম্পূর্ণ তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় পরিসরে শুল্কছাড় বাংলাদেশের দেশীয় শিল্প ও কৃষিখাতে প্রতিযোগিতার চাপ বাড়াতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুল্কছাড় দেওয়া ৬ হাজার ৭১০টি মার্কিন পণ্যের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ১৬টি ইতোমধ্যে বাংলাদেশে আমদানি হচ্ছে। এসব আমদানির মোট মূল্য প্রায় ৬৫ কোটি ডলার। বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, শুল্ক কমানো বা তুলে নেওয়ার ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে কয়েকশ কোটি টাকা।
অন্যদিকে বাংলাদেশের যেসব পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সুবিধা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর ব্যবহার তুলনামূলকভাবে সীমিত। ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যের তালিকার মধ্যে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১৪টি পণ্য। এসব রপ্তানির মোট মূল্যও খুবই কম বলে পরিসংখ্যানে উল্লেখ রয়েছে।
সব মিলিয়ে এই চুক্তি ঘিরে অর্থনীতি, বাণিজ্যনীতি ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ এটিকে দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে সরকারিভাবে এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
চুক্তি অনুযায়ী, যেসব পণ্যে শুল্কছাড় দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য রাজস্ব ছাড়ের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দেড় কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের দাবি, এর বিপরীতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি কয়েকশ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রও ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটি বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, উত্তোলন, পরিশোধন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিতরণ ও রপ্তানিতে সরাসরি অংশ নিতে পারবে।
এছাড়া চুক্তিতে বাংলাদেশকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়ের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বৃদ্ধির বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত আছে। একই সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট দেশের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের কথাও বলা হয়েছে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করতে হবে। এর মধ্যে প্রতি বছর ৭ লাখ টন করে পাঁচ বছর ধরে গম, প্রতিবছর ১.২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সয়া ও সয়াজাত পণ্য এবং তুলা আমদানির বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অশুল্ক বাধা কমানোর বিষয়েও চুক্তিতে বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ক্ষেত্রে এমন কোনো আমদানি লাইসেন্সিং নীতি প্রযোজ্য করা যাবে না, যা তাদের পণ্যের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত করে। ফলে মার্কিন শিল্প ও চিকিৎসাপণ্য সরাসরি বাংলাদেশে বাজারজাত করার সুযোগ পাচ্ছে, যা আগে পরীক্ষা ও অনুমোদনের ধাপ পার করতে হতো।
এছাড়া কৃষি ও জৈব প্রযুক্তি পণ্যের ক্ষেত্রেও পরীক্ষানিরীক্ষার প্রক্রিয়া শিথিল করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি মানদণ্ডকে বাংলাদেশে স্বীকৃতি দিতে হবে। মাংস, পোলট্রি ও ডিমের ক্ষেত্রে ইউএসডিএ ফুড সেফটি অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিসের মানদণ্ডকে চূড়ান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। জেনেটিক্যালি মোডিফায়েড পণ্যের ক্ষেত্রেও বাধা ও লেবেলিংয়ের শর্ত কার্যত শিথিল করা হয়েছে।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতা দিতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, টেলিকম, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সমান সুযোগ দিতে হবে। তেল-গ্যাস, বিমা ও টেলিযোগাযোগ খাতে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর কোনো সীমা আরোপ করা যাবে না বলেও উল্লেখ রয়েছে।
বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা করপোরেশনে পুনর্বীমার যে কাঠামো রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে না—এমন শর্তও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত আছে। চুক্তিতে ‘রুলস অব অরিজিন’ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চুক্তির সুবিধা যদি তৃতীয় কোনো দেশের কাছে উল্লেখযোগ্যভাবে চলে যায়, তাহলে যেকোনো পক্ষ নিয়ম পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখবে।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের একটি অংশ এই চুক্তিকে ‘অসম’ ও ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, এতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্য কৌশল এবং চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও বিনিয়োগ আকর্ষণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনের শর্তও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চুক্তি কার্যকর করতে দুই দেশের সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বেশ কিছু আইন সংশোধনের বিষয়ও সামনে আসবে। তাই তারা চুক্তির বিভিন্ন শর্ত পুনর্মূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছেন।
বহুজাতিক মার্কিন কোম্পানিগুলোর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা স্থানীয় কোম্পানির তুলনায় অনেক বেশি। ফলে সমান সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলে দেশীয় শিল্প খাত চাপের মুখে পড়তে পারে। গ্যাসসংকটের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিকে গ্যাস রপ্তানির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো ধরনের অবাণিজ্যিক সহায়তা বা ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে ভর্তুকি ও প্রণোদনার তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে জানাতে হবে।
ছয় মাসের মধ্যে এসব তথ্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। নামমাত্র বাণিজ্যচুক্তি হলেও এতে জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুও যুক্ত হয়েছে। শর্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিরাপত্তাজনিত কারণে কোনো বাণিজ্য বা সীমান্ত ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বাংলাদেশকেও একই ধরনের ‘পরিপূরক বিধিনিষেধ’ গ্রহণ করতে হবে।

