দেশের বিদ্যুৎ খাতে ভারত ও চীনের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত চারটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের অভ্যন্তরীণ এক নথিতে বলা হয়েছে, এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার খরচ বা ট্যারিফ অস্বাভাবিকভাবে বেশি নির্ধারিত হয়েছে। আগের সরকারের সময় করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) কিছু শর্তই এই পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
যেসব কেন্দ্র নিয়ে প্রশ্ন: এই চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র হলো—
০১. ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি গ্রুপের গোড্ডা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র,
০২. বাগেরহাটের রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র (বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট),
০৩. পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র (বাংলাদেশ-চীন যৌথ উদ্যোগ),
০৪. এবং আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের (আরএনপিএল) পটুয়াখালী কেন্দ্র।
অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির জন্য প্রস্তুত করা নথিতে বলা হয়েছে, এই কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও উচ্চ ট্যারিফের কারণে দেশের আর্থিক চাপ বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে বড় অঙ্কের ভর্তুকির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, শুধু এই চারটি কেন্দ্রের জন্যই বছরে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে।
নথিতে বলা হয়েছে, এসব চুক্তিতে রিটার্ন অন ইকুইটি (আরওই), নন-রেগুলেটেড রিটার্ন অন ইকুইটি (এআরওই), পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় (ওঅ্যান্ডএম কস্ট) এবং হিট রেটের মতো উপাদান এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয় ও ক্যাপাসিটি চার্জ সরকারের ওপর বড় আর্থিক দায় তৈরি করছে। সরকার এখন ভারত ও চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এসব চুক্তি পুনর্বিবেচনার চিন্তা করছে। লক্ষ্য হলো ট্যারিফ কমিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানো।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটি আগেই বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর চুক্তি পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করেছিল। কমিটির মতে, দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে গিয়ে কিছু চুক্তিতে অতিরিক্ত ব্যয় ও ঝুঁকি রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জ, ডলারভিত্তিক পরিশোধ এবং উচ্চ রিটার্ন নিশ্চয়তার বিষয়গুলো বড় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, চুক্তি সংশোধনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা বিদেশি ঋণ। পায়রা ও রামপাল কেন্দ্রের বিপরীতে বিদেশি ঋণ রয়েছে এবং এর জন্য রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিও দেওয়া হয়েছে। তাই ট্যারিফ কমাতে হলে সংশ্লিষ্ট ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন প্রয়োজন, যা এখনো পাওয়া যায়নি। এ কারণে সংশোধিত প্রস্তাব এখনো সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে তোলা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে পায়রা (১৩২০ মেগাওয়াট) ২০২০ সালে এবং রামপাল (১৩২০ মেগাওয়াট) ২০২৪ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনে গেছে। তবে আরএনপিএল কেন্দ্র এখনো পুরোপুরি বাণিজ্যিকভাবে চালু হয়নি। এর একটি ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে, কিন্তু পূর্ণ উৎপাদন না থাকায় অর্থ সংকট তৈরি হয়েছে।
গোড্ডা কেন্দ্র থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। তবে কয়লার দাম নির্ধারণ নিয়ে আদানি গ্রুপ ও পিডিবির মধ্যে বিরোধ রয়েছে, যা এখন সিঙ্গাপুরে সালিশ পর্যায়ে রয়েছে। আদানির দাবি অনুযায়ী, মার্চ পর্যন্ত বকেয়া প্রায় ৬৮৮ মিলিয়ন ডলার।
ভর্তুকির ভবিষ্যৎ হিসাব: বিদ্যুৎ বিভাগের নথি অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে শুধু এই চার কেন্দ্রের জন্য সম্ভাব্য ভর্তুকি দাঁড়াতে পারে প্রায় ২৭ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে—
- আদানি পাওয়ার: ৭,৮২১ কোটি টাকা
- পায়রা কেন্দ্র: ৬,৮২৫ কোটি টাকা
- রামপাল কেন্দ্র: ৬,৮১৪ কোটি টাকা
- আরএনপিএল: ৬,২৬০ কোটি টাকা
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে গ্যাস ও তেলচালিত কেন্দ্রগুলো সংকটে পড়েছে। ফলে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এতে কয়লা আমদানির ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ভর্তুকির চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চলতি অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ খাতে মোট বরাদ্দ ৩৬ হাজার কোটি টাকার মধ্যে বড় অংশ ইতোমধ্যে ব্যয় হয়ে গেছে। এর বাইরে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত আরও ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে।আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরে এই ঘাটতি আরও বেড়ে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে করা চুক্তিগুলোর আর্থিক প্রভাব এখন স্পষ্ট। উচ্চ ট্যারিফ, ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং ভর্তুকিনির্ভর কাঠামো পুরো খাতকে চাপে ফেলেছে। তাই চুক্তি পুনর্বিবেচনা জরুরি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, চুক্তি ও ট্যারিফ পর্যালোচনার কাজ চলছে। তবে বিদেশি ঋণদাতাদের অনুমোদন ছাড়া বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়। বিদ্যুৎমন্ত্রীও জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকলেও কিছু কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে। সরকার বর্তমানে সব চুক্তি যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
