গত ১৮ এপ্রিল জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, যা এপ্রিল মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। এই বৃদ্ধির ধারা শুধু খাদ্য খাতে নয়, খাদ্যবহির্ভূত সব ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা গেছে।
এর ফলে এখন আর শুধু চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস বা সবজির দামই নয়, বরং বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন, পোশাক এবং জ্বালানিসহ দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব খরচই বেড়ে গেছে। সাধারণ মানুষের জীবনে এই চাপ সামলানো কতটা কঠিন হবে, তা নিয়ে এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি তেল এমন একটি পণ্য, যার দাম বাড়লে পুরো অর্থনীতিতেই তার প্রভাব পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকেও কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর প্রভাবে সরকার দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। এতে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গিয়ে শাকসবজি থেকে শুরু করে মাছ-মাংসসহ নিত্যপণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। যদিও চালের বাজার আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে, তবে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে যাতায়াত খরচও বেড়েছে।
একই সময়ে মজুরি হারের কোনো উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি না হওয়ায় বাস্তবে মানুষের আয় কমে গেছে। অর্থাৎ আয় বাড়ার তুলনায় ব্যয় বেড়েছে অনেক বেশি, যার ফলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের।
এমন বাস্তবতায় বিদ্যুৎ খাতেও দাম বাড়ানোর প্রস্তাব সামনে এসেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের নীতিগত অনুমোদনের পর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য কারিগরি কমিটি গঠন করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে দেড় টাকা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে। পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়লে তার প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই খুচরা পর্যায়েও পড়বে।
অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, আগের সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ খাতে একাধিক ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়, যেগুলোর কারণে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বড় অঙ্কের ব্যয় বহন করতে হয়েছে। দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার খরচ কমানোর উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। অন্যদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানোর যুক্তি তুলে ধরা হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, চুরি, অপচয় ও অদক্ষতা নিয়ন্ত্রণ না করে শুধু দাম বাড়ানো হলে তার চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে।
বর্তমান পরিসংখ্যান আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈষম্য তুলে ধরছে—শহরের তুলনায় গ্রামে মূল্যস্ফীতি বেশি। গ্রামের নিম্নআয়ের পরিবার, কৃষিশ্রমিক, দিনমজুর এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষদের আয় অনিয়মিত হওয়ায় মূল্যবৃদ্ধির চাপ সেখানে অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান যে মত দিয়েছেন, তাতে বলা হয়েছে—গ্রামীণ ও শহুরে দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত, স্থির আয়ের মানুষ এবং অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও লক্ষ্যভিত্তিক করা জরুরি। পাশাপাশি খাদ্যসহায়তা, স্বল্পমূল্যে নিত্যপণ্য সরবরাহ, নগদ সহায়তা এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক উদ্যোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ খাতের সম্ভাব্য দাম বৃদ্ধি—সবকিছু মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও গভীর হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

