বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বাস ও ট্রাক ইউনিটগুলোতে একদিকে বাড়ছে লোকসানে চলা যানবাহনের সংখ্যা, অন্যদিকে কমছে গুরুত্বপূর্ণ ট্রাক ডিপোগুলোর রাজস্ব আয়। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসের কার্যক্রম বিশ্লেষণে এমনই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
সংস্থাটির সাম্প্রতিক সমন্বয় সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারিতে শুধু অপারেশনাল বাসই কমেনি, বরং লোকসানে থাকা বাসের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এখন জ্বালানি খরচে কঠোরতা এবং রাজস্ব ফাঁকি রোধে নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ।
অধিকাংশ বাস ডিপোতেই লোকসানের চাপ:
বিআরটিসির তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে বরিশাল, বগুড়া ও টুঙ্গিপাড়া বাস ডিপো ছাড়া প্রায় সব ডিপোতেই সচল বাসের সংখ্যা কমেছে। একই সঙ্গে বরিশাল, বগুড়া ও রংপুর বাদে অধিকাংশ ডিপোতে সচল বাসের ১০ শতাংশের বেশি ‘বসা’ বা অকেজো অবস্থায় ছিল। রাজস্ব আয়ের দিক থেকেও পরিস্থিতি ভালো নয়। পরিচালক (প্রশাসন ও অপারেশন) মো. রাহেনুল ইসলাম জানিয়েছেন, বরিশাল, দিনাজপুর, খুলনা ও টুঙ্গিপাড়া ছাড়া বাকি ডিপোগুলো নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি।
ফেব্রুয়ারিতে বরিশাল, কল্যাণপুর, খুলনা, রংপুর, সোনাপুর, আইসিডব্লিউএস, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বাস ডিপো বাদে অন্য সব ইউনিট লোকসানের মুখে পড়ে। জানুয়ারিতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ওই মাসে কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও পাবনা ছাড়া প্রায় সব ডিপোই নির্ধারিত ট্রিপ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়। পাশাপাশি লোকসানি বাসের সংখ্যা ৪৫ থেকে বেড়ে ফেব্রুয়ারিতে দাঁড়ায় ৬৩টিতে।
বিআরটিসির অন্যতম আয়ের খাত ট্রাক ডিপোগুলোতেও পতন লক্ষ্য করা গেছে। ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৭২ লাখ ৮৪ হাজার টাকা, যা জানুয়ারির তুলনায় প্রায় ৪৫ লাখ টাকার বেশি কম। ঢাকা ট্রাক ডিপোর অবস্থাও একই রকম। জানুয়ারিতে যেখানে আয় ছিল ৭ কোটি ৯৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা, ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে এসেছে ৭ কোটি ২৮ লাখ ৩০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ আয় কমেছে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা। এই পরিস্থিতিতে ট্রাকের (টু-পেসহ) রাজস্ব বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে নতুন বাস যুক্ত হয়েছে কয়েকটি ডিপোতে। এর মধ্যে মতিঝিল ডিপোতে ১১টি, গাবতলী ও টুঙ্গিপাড়ায় ৪টি করে, বগুড়া ও নারায়ণগঞ্জে ৩টি করে এবং মোহাম্মদপুরে ১টি বাস যুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে রংপুর, দিনাজপুর, গাজীপুর ও মিরপুর ডিপোতে বাসের সংখ্যা কমেছে।
স্টাফ বাস চলাচলেও অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। সাধারণভাবে শুক্র ও শনিবার স্টাফ বাস চালু থাকলেও বরিশাল, রংপুর, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, নরসিংদী, সিলেট ও টুঙ্গিপাড়া ডিপো ওই দিনগুলোতে স্টাফ বাস পরিচালনা করেনি।
জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নতুন সীমা নির্ধারণ করেছে বিআরটিসি। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বগুড়া, দিনাজপুর, সিলেট, রংপুর, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও কক্সবাজার ডিপো নির্ধারিত সীমার চেয়ে ৫০ শতাংশের বেশি জ্বালানি ব্যয় করেছে বলে জানা গেছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাসের ক্ষেত্রে জ্বালানি ব্যয় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ এবং ট্রাকের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখতে হবে।
এছাড়া যান্ত্রিক ত্রুটি বা ‘ব্রেক ডাউন’ সংক্রান্ত তথ্য এখন থেকে ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) দিয়ে যাচাই করা হবে। সচল বাসকে অকারণে বসিয়ে রাখা হলে সংশ্লিষ্ট ডিপোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
বিআরটিসির অর্থ বিভাগে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অনাদায়ী অর্থ রয়েছে। গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চালক ও কন্ডাক্টরদের কাছ থেকে প্রায় ৬ লাখ ৬৯ হাজার টাকা আদায় হয়নি। অন্যদিকে সিপিএফ বাবদ ২ কোটি ১৪ লাখ টাকা এবং গ্রাচ্যুইটি বাবদ ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা অনাদায়ী রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেনারেল ম্যানেজার (হিসাব) আবদুল্লাহ আল মাসুদ।
একই রুটে একাধিক ডিপোর বাস চলাচলের কারণে রাজস্ব ক্ষতির বিষয়টিও উঠে এসেছে। এ প্রেক্ষিতে চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা নির্দেশ দিয়েছেন, একই রুটে একাধিক ডিপোর বাস না চালিয়ে নির্দিষ্ট ডিপোর অধীনে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে হবে।
ডিপোভিত্তিক আয় বৃদ্ধি ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিট লাভ নিশ্চিত করতে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) এর নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি প্রতি সপ্তাহে প্রতিটি ডিপোর আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করে সরাসরি চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন দেবে।
বর্তমানে ব্যাংক স্থিতি থাকা সাপেক্ষে প্রতিদিনের নিট লাভের একটি অংশ পরদিনই বিআরটিসির কোষাগারে জমা করার প্রক্রিয়াও চালু করা হয়েছে।

