বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা গেছে দেশের বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহে। সেই সময় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় নিট এফডিআই কমেছে ১৮.৪২ শতাংশ। এই প্রান্তিকে দেশে নিট এফডিআই এসেছে ১০ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ২০২৪ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৩ কোটি ২৮ লাখ ১০ হাজার ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাই এই পতনের প্রধান কারণ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ওই সময়ে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ ছিল না। রাজনৈতিক সমঝোতা কোন দিকে যাবে, তা নিয়েও স্পষ্টতা ছিল না। ফলে বিদেশি ঋণ বা বিনিয়োগ আসার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত ছিল না। তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার কিছু উদ্যোগ নিলেও সেগুলো কার্যকরভাবে এগোতে পারেনি। পাশাপাশি সরকার কতটা স্থায়ী হবে—এই অনিশ্চয়তাও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহ করেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নির্বাচন নিয়ে স্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
একই সময়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পুনঃবিনিয়োগকৃত মুনাফাও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে ৩৫.৩১ শতাংশ। ২০২৫ সালের অক্টোবর–ডিসেম্বর শেষে রি-ইনভেস্টেড আর্নিংস দাঁড়ায় ২১ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, যেখানে ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ৩২ কোটি ৫৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
রি-ইনভেস্টেড আর্নিংস বলতে বোঝায় বিদেশি কোম্পানিগুলোর স্থানীয় মুনাফা, যা লভ্যাংশ হিসেবে দেশে না পাঠিয়ে পুনরায় বিনিয়োগ করা হয়। এটি সাধারণত বিনিয়োগ আস্থার একটি সূচক হিসেবে ধরা হয়। তবে প্রকৃত এফডিআই প্রবৃদ্ধি মূলত নতুন ইকুইটি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে, যা এ সময় দুর্বল ছিল।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি কোম্পানিগুলো পুনঃবিনিয়োগ কমিয়েছে। তার মতে, নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা থাকায় বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছিলেন, যদিও পরবর্তীতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, কাঠামোগত সমস্যাও বিদেশি বিনিয়োগ কমার বড় কারণ। সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা না থাকা, ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশেষ করে বন্দর ব্যবস্থাপনা, পরিবহন ও লজিস্টিক সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতার ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এ খাতে পিছিয়ে আছে বলেও মন্তব্য করেন।
মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, এসব কাঠামোগত সমস্যা সমাধান না হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এলেও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ কঠিন হবে। তার ভাষায়, বিনিয়োগকারীরা শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং সুবিধা ও পরিবেশের বাস্তবতা আগে বিবেচনা করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, শুধু বিদেশি নয়, দেশে বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগের গতি কমেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, দেশি ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারীর মধ্যেই নতুন বিনিয়োগে অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। নীতিগত জটিলতা দূর না হলে পরিস্থিতি বদলানো কঠিন হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইকুইটি, রি-ইনভেস্টেড আর্নিংস এবং আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ—এই তিন উপাদান মিলিয়ে ২০২৫ সালের অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে মোট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৩৬ কোটি ৩৮ লাখ ২০ হাজার ডলার। ২০২৪ সালের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৪৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

