বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক জটিল বাস্তবতার মুখে। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, জ্বালানি সংকট, বাজেট ঘাটতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ পাওয়া শুধু অর্থ সংগ্রহের বিষয় নয়, বরং বৈশ্বিক আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ঋণ কর্মসূচি সচল রাখা নীতিনির্ধারকদের জন্য অগ্রাধিকারের পর্যায়ে চলে এসেছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নিয়ে দেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও বাজেট সহায়তার লক্ষ্যে আইএমএফসহ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বড় আকারের ঋণ প্যাকেজ পাওয়ার চেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই প্যাকেজের পরিমাণ ৩০০ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে।
ঋণপ্রাপ্তির পথ সহজ করতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের পথে হেঁটেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের মূল্য ব্যবধান এবং ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান চাপ এই সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু অভ্যন্তরীণ চাপ কমানোর উদ্যোগ নয়, বরং আইএমএফের শর্তপূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কারণ সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে, যা বাজেট ঘাটতি কমাতে সহায়ক বলে তারা মনে করে।
বর্তমানে অর্থনীতি বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা এবং বাড়তে থাকা সরকারি ব্যয়—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় আইএমএফের ঋণ কেবল অর্থের উৎস নয়, বরং নীতিগত আস্থার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ঋণের কিস্তি বিলম্বিত হলে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের ভর্তুকি সরকারকে বড় আর্থিক চাপের মধ্যে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফলে ভর্তুকি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সময়ে রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় সরকারের সামনে বিকল্প পথ সীমিত হয়ে যায়। এ বাস্তবতায় জ্বালানির দাম সমন্বয় প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে।
আইএমএফ ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে, কাঠামোগত সংস্কারে অগ্রগতি না হলে ঋণ ছাড় অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি মূল্য সমন্বয়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, এর মাধ্যমে সরকার দেখাতে চেয়েছে যে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে তারা প্রস্তুত, যদিও তা কঠিন।
তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়ে পরিবহন, উৎপাদন ও সরবরাহ খাতে। এর ফলে পণ্যমূল্য বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই চাপ মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদে খাদ্য ও নগদ সহায়তাভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে ভর্তুকির মাধ্যমে কম দামে জ্বালানি সরবরাহ করা হলেও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এর পূর্ণ সুফল পাওয়া যায়নি। জ্বালানি সংকটের কারণে আগেই পরিবহন ব্যয় বেড়েছিল, যা পণ্যমূল্য বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখন মূল্য সমন্বয়ের পর সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন আইএমএফকে একটি ‘সিগন্যালিং ইনস্টিটিউশন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, কোনও দেশের অর্থনৈতিক নীতি ও সংস্কারে আইএমএফ সন্তুষ্ট থাকলে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাও সেই দেশের ওপর আস্থা পায়। ফলে আইএমএফ কর্মসূচি সচল থাকলে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা বা আইএফসির মতো সংস্থা থেকেও অর্থায়ন পাওয়া সহজ হয়।
বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আইএমএফের ঋণ সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়াতে সহায়তা করে। পাশাপাশি এটি বাজেট সহায়তা হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে, যা সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়।
তবে এই ঋণের সঙ্গে যুক্ত শর্তগুলো বাস্তবায়ন সহজ নয়। ব্যাংক খাত সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ভ্যাট কাঠামো সরলীকরণ এবং বিনিময় হার ব্যবস্থায় পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এখনো অগ্রগতি ধীর। ফলে পরবর্তী কিস্তি ছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। বাকি ১৮৬ কোটি ডলারের মধ্যে ষষ্ঠ কিস্তির ১৩০ কোটি ডলার এখনও ছাড় হয়নি। আইএমএফের পর্যালোচনা মিশন মে মাসে ঢাকায় আসতে পারে। এ কারণে জুনের বোর্ড বৈঠকে কিস্তি ছাড়ের সম্ভাবনা কমে গেছে, এবং সরকার জুলাইয়ের বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছে।
সরকার অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে আইএমএফের সরাসরি সম্পর্ক নেই। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, আইএমএফ বৈঠকের আগেই দেশে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তার দাবি, দীর্ঘদিন ভর্তুকির মাধ্যমে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার ফলে রাষ্ট্রীয় তহবিলে চাপ তৈরি হচ্ছিল, সেই চাপ সামাল দিতেই সীমিত পরিসরে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে আইএমএফের ঋণ বাংলাদেশের জন্য তিনভাবে গুরুত্বপূর্ণ— এটি বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ায়, অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থায়নের পথ সহজ করে এবং অর্থনৈতিক সংস্কারে নীতিগত চাপ সৃষ্টি করে।
সব মিলিয়ে, আইএমএফের ঋণ এখন শুধু অর্থ সহায়তা নয়; এটি অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বৈশ্বিক আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। এই বাস্তবতায় একদিকে ঋণ নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

