ভ্যাট ফাঁকি রোধে এবার বড় ধরনের অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজস্ব ঝুঁকিতে থাকা ১০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে এনে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে অতিরিক্ত ৩৮ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি।
এনবিআর সূত্র জানায়, যেসব প্রতিষ্ঠানের মাসিক লেনদেন ১০ লাখ টাকার বেশি এবং যাদের ক্ষেত্রে ভ্যাট ফাঁকির ঝুঁকি বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে, তাদেরই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভ্যাট ফাঁকির সন্দেহ থাকা কিছু ছোট প্রতিষ্ঠানও এই কার্যক্রমের আওতায় আসবে। তবে মূল নজর থাকবে মাঝারি ও বড় ভ্যাটদাতা প্রতিষ্ঠানের ওপর।
এই তালিকায় আমদানিকারক, উৎপাদনকারী, রিয়েল এস্টেট, ই-কমার্স, স্থানীয় সরবরাহকারী এবং অন্যান্য ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে, তাদের ওপর কড়াকড়ি নজরদারি চালানো হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ৮ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ফাঁকি শনাক্ত করে অতিরিক্ত ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে চায় এনবিআরের ভ্যাট বিভাগ। এছাড়া বছরে এক কোটি টাকার বেশি ভ্যাট পরিশোধ করে এমন প্রায় ২ হাজার বড় প্রতিষ্ঠানের ওপরও বিশেষ অভিযান চালানো হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে স্বাভাবিক আদায়ের বাইরে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে।
সব মিলিয়ে ১০ হাজার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩৫ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য প্রয়োগমূলক কার্যক্রম থেকে আরও ৩ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ৩৮ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ভ্যাট আদায়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সোমবার এনবিআরে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের কাছে এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়।
এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে অতিরিক্ত ৯৯ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট রাজস্ব আদায় করা হবে। এর মধ্যে ১০ হাজার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৩৮ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া তামাক খাত থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা, বকেয়া আদায় থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং স্বাভাবিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ফলে আরও ২০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
এদিকে নতুন অর্থবছরে আয়কর ফাঁকি রোধেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে এনবিআর। উৎসে কর কর্তনকারী কোনো প্রতিষ্ঠান আইন না মানলে তাদের নথিপত্র ও কম্পিউটার জব্দ করার পরিকল্পনার কথাও ইতোমধ্যে জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের দাবি, অতিরিক্ত প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা ব্যবসার পরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ নিয়মিত পরিপালন করছে না। এই ঘাটতি কমানো গেলে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব।
একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভ্যাট ব্যবস্থায় কমপ্লায়েন্সের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এসব দুর্বলতা দূর করা গেলে রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব হবে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, আবাসন খাতে সম্পত্তি কেনাবেচায় নানা অসঙ্গতি রয়েছে। সেগুলো কার্যকরভাবে শনাক্ত করা গেলে এই খাত থেকেই বিপুল পরিমাণ ভ্যাট আদায় করা সম্ভব। ইতোমধ্যে একটি শীর্ষ রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটনের কথাও জানান তিনি।
তার ভাষ্য, রিয়েল এস্টেট খাতে ফাঁকি শনাক্তের জন্য আলাদা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং বিশেষায়িত প্রয়োগ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এটি আগের অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি এবং দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বার্ষিক রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য।
এর মধ্যে শুধু ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক খাত থেকেই ৩ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি।
যদিও অর্থনীতিতে এখনো শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়নি, তারপরও রাজস্ব বাড়াতে শুরু থেকেই ফাঁকি রোধে জোর দিচ্ছে সরকার।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি খুব বেশি না বাড়লেও ভ্যাট ফাঁকি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, দেশের অর্থনীতির আকার বিবেচনায় ভ্যাটযোগ্য সব লেনদেন থেকে সঠিকভাবে ভ্যাট আদায় করা গেলে বর্তমান সংগ্রহ অন্তত দ্বিগুণ হতে পারে।
তার মতে, অনেক প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের আওতায় থাকলেও কর দেয় না। আবার কেউ কেউ প্রকৃত দায়ের তুলনায় অনেক কম ভ্যাট পরিশোধ করে। এমনও প্রতিষ্ঠান আছে, যারা ক্রেতার কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করলেও তা সরকারি কোষাগারে জমা দেয় না।
তিনি মনে করেন, অটোমেশন বাড়ানো এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় জোরদার করা গেলে ভ্যাট ফাঁকি রোধ আরও কার্যকর হবে। এতে অপ্রয়োজনীয় তল্লাশি বা ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির প্রয়োজনও কমে আসবে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ লাখ প্রতিষ্ঠান নিয়মিত মাসিক রিটার্ন জমা দেয়। তবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিষ্ঠান শূন্য রিটার্ন দাখিল করে, অর্থাৎ তারা কোনো ভ্যাট দায় নেই বলে জানায়।
এনবিআরের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মাঠপর্যায়ের রাজস্ব কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে।

