বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা পতন দেখা যাচ্ছে। শক্তিশালী মার্কিন ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে মূল্যবান এই ধাতুর বাজারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, স্বর্ণের দাম কমার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং ফেডের পরবর্তী মুদ্রানীতি নিয়ে বাজারের অপেক্ষা। বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার সংক্রান্ত ইঙ্গিতের দিকে নজর রাখছেন।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই ২০২৬) সকাল ৯টা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম ০.৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪,০৪৪.৮১ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে আগস্ট ডেলিভারির মার্কিন স্বর্ণ ফিউচারের দামও ০.৮ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪,০৪৫.৪০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
স্বর্ণের বাজারে ডলারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিকভাবে স্বর্ণের লেনদেন মূলত মার্কিন ডলারে হয়। যখন ডলারের মূল্য বেড়ে যায়, তখন ইউরো, ইয়েন বা অন্যান্য মুদ্রায় থাকা বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বর্ণ কেনা তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। এর ফলে স্বর্ণের চাহিদা কমে যায় এবং দামের ওপর চাপ তৈরি হয়।
বর্তমানে মার্কিন ডলার প্রায় এক মাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। ডলারের এই শক্তিশালী অবস্থানের কারণে অনেক বিনিয়োগকারী স্বর্ণে নতুন বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করছেন। তারা অপেক্ষা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতির পরবর্তী দিকনির্দেশনার জন্য।
স্বর্ণের বাজারে আরেকটি বড় প্রভাবক হলো ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার নীতি। ফেডের দুই দিনের নীতিনির্ধারণী বৈঠক বুধবার শেষ হওয়ার কথা। বাজারের একটি অংশ মনে করছে, এবার সুদের হার অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে। তবে সেপ্টেম্বরে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
সাধারণত সুদের হার বাড়লে স্বর্ণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কারণ স্বর্ণ কোনো সুদ প্রদান করে না। অন্যদিকে সুদযুক্ত বিনিয়োগ যেমন সরকারি বন্ড বা অন্যান্য আর্থিক সম্পদ বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ফলে অনেকেই স্বর্ণের পরিবর্তে এসব সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যদি ফেড ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়ানোর বিষয়ে কঠোর অবস্থান না নেয়, তাহলে স্বর্ণের দাম আবারও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম আবারও ৪,২০০ ডলারের ওপরে উঠার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের বাজারে কিছুটা অপেক্ষার নীতি গ্রহণ করছেন। কারণ তারা দেখতে চাইছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হার নিয়ে ফেডের পরবর্তী অবস্থান কী হয়।
সাধারণত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি বা বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তবে বর্তমানে ডলারের শক্তি এবং সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা স্বর্ণের সেই চাহিদাকে কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে।
শুধু স্বর্ণ নয়, অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও একই ধরনের চাপ দেখা গেছে। একই সময়ে রূপার দাম ১.৯ শতাংশ, প্লাটিনামের দাম ১ শতাংশ এবং প্যালাডিয়ামের দাম ১.৬ শতাংশ কমেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বর্তমানে পুরো মূল্যবান ধাতুর বাজারেই বিক্রির চাপ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে স্বর্ণের দাম মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে—মার্কিন ডলারের গতিপথ, ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি।
যদি ডলার আরও শক্তিশালী হয় এবং ফেড সুদের হার বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয়, তাহলে স্বর্ণের দামে আরও চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে ফেড যদি অপেক্ষাকৃত নমনীয় অবস্থান নেয় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ে, তাহলে আবারও স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে পারে।
এই মুহূর্তে বিশ্ববাজারের বিনিয়োগকারীরা ফেডের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতির পরবর্তী বার্তাই নির্ধারণ করবে স্বর্ণের বাজার আবার ঊর্ধ্বমুখী হবে, নাকি আরও কিছুদিন চাপের মধ্যে থাকবে।

